Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
রবার্ট ব্রাউনিংয়ের 'My Last Duchess' ইংরেজি সাহিত্যের ভিক্টোরীয় যুগের একটি শ্রেষ্ঠ 'ড্রামাটিক মনোলগ' (Dramatic Monologue)। কবিতাটি একদিকে যেমন শিল্পপ্রেম ও আভিজাত্যের কথা বলে, অন্যদিকে তা পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ ও মানসিক বিকৃতির এক অন্ধকার চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
কবিতাটির বিষয়বস্তু
কবিতাটির পটভূমি ইতালির রেনেসাঁ যুগ। ফেরারা শহরের একজন অত্যন্ত অহংকারী ডিউক তার মৃত স্ত্রীর (লাস্ট ডাচাস) একটি প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তার শ্রোতা হলেন পাশের রাজ্যের এক দূত, যিনি ডিউকের নতুন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।
ঈর্ষা ও নিয়ন্ত্রণ: ডিউক তার পূর্বতন স্ত্রীর ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন কারণ ডাচাস ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল এবং প্রাণোচ্ছল। ডিউকের ৯০০ বছরের পুরনো বংশগৌরব বা তার দেওয়া দামি উপহার ডাচাসের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়নি; তিনি সূর্যাস্ত বা সাদা ঘোড়ায় চড়া—সবকিছুতেই সমান আনন্দ পেতেন। ডিউকের কাছে এই 'সহজ আনন্দ' ছিল অবমাননাকর।
নিষ্ঠুরতা: ডিউক চেয়েছিলেন ডাচাস কেবল তার জন্য হাসবেন। যেহেতু ডাচাস তার স্বভাব পরিবর্তন করেননি, তাই ডিউক 'নির্দেশ' (Commands) দিলেন এবং ডাচাসের সমস্ত হাসি থেমে গেল—যা পরোক্ষভাবে তাকে হত্যার ইঙ্গিত দেয়।
ভোগবাদী শিল্পপ্রীতি: কবিতার শেষে দেখা যায়, ডিউক ডাচাসের প্রতিকৃতিটি একটি জড় বস্তুর মতো প্রদর্শন করছেন। তিনি ডাচাসকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং তার সংগ্রহের একটি 'পুতুল' বা শিল্পকর্ম হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করেন।
পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
পাশ্চাত্য সাহিত্যে এই কবিতাটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়:
ড্রামাটিক মনোলগের পূর্ণতা: ব্রাউনিং এই কবিতার মাধ্যমে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা মাপার নতুন পথ দেখিয়েছেন। টি.এস. এলিয়ট বা এজরা পাউন্ডের মতো আধুনিক কবিরা ব্রাউনিংয়ের এই আঙ্গিক দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের সমালোচনা: কবিতাটি তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের ভণ্ডামি এবং নারীদের ওপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের চিত্র তুলে ধরে, যা পরবর্তীকালের নারীবাদী সাহিত্যের (Feminist Literature) অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরিত্র চিত্রণ: খলনায়ক বা নেতিবাচক চরিত্রের জবানবন্দিতে কীভাবে সত্য ও মিথ্যার জটিল জাল বোনা যায়, তা এই কবিতা শিখিয়েছে।
প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব
বাংলা সাহিত্য তথা প্রাচ্য সাহিত্যে ব্রাউনিংয়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী, বিশেষ করে যখন বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ড্রামাটিক মনোলগ: রবীন্দ্রনাথের 'কাহিনি' বা 'গাথা' জাতীয় কবিতায় চরিত্রের স্বগতোক্তির যে ব্যবহার দেখা যায়, তাতে ব্রাউনিংয়ের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যদিও রবীন্দ্রনাথের চরিত্ররা অনেক বেশি মানবিক, কিন্তু 'নাটকীয়তা'র কাঠামোটি পাশ্চাত্যের এই ধারার ঋণী।
তিরিশের দশকের কবিরা: জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় যখন ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ধরা দেয়, তখন সেখানে ব্রাউনিংয়ের প্রবর্তিত 'মনোলগ' বা আত্মকথনের ছায়া স্পষ্ট হয়।
নারীবাদী চেতনা: প্রাচ্যের আধুনিক সাহিত্যে যখন নারীর বন্দিদশা এবং পুরুষের 'মালিকানা' সুলভ মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়, তখন 'My Last Duchess' অনেক লেখকের কাছে একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ চরণের ব্যাখ্যা
১. "That’s my last Duchess painted on the wall, / Looking as if she were alive."
ব্যাখ্যা: এই শুরুতেই 'Last' শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে ডিউকের একাধিক স্ত্রী ছিল এবং 'Alive' শব্দটি একটি শীতল আবহ তৈরি করে। ডিউক তার স্ত্রীকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং দেয়ালের একটি জড় 'পেন্টিং' হিসেবেই বেশি পছন্দ করেন, কারণ এখন তিনি তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন।
২. "She had / A heart—how shall I say?—too soon made glad, / Too easily impressed..."
ব্যাখ্যা: ডিউকের দৃষ্টিতে এটি ডাচাসের অপরাধ ছিল। তিনি সবার প্রতি দয়ালু ও হাসিখুশি ছিলেন। ডিউক চেয়েছিলেন তার স্ত্রী কেবল তার '৯০০ বছরের পুরনো বংশগৌরব' (nine-hundred-years-old name) নিয়েই গর্বিত থাকবেন, কিন্তু ডাচাস সাধারণ মানুষের সামান্য উপহারকেও সমান গুরুত্ব দিতেন।
৩. "I gave commands; / Then all smiles stopped together."
ব্যাখ্যা: এটি কবিতার সবচেয়ে ভয়াবহ এবং রহস্যময় চরণ। এখানে ডিউক সরাসরি হত্যার কথা না বললেও 'নির্দেশ' দেওয়ার মাধ্যমে ডাচাসের হাসি চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এটি তার চরম নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার দম্ভকে ফুটিয়ে তোলে।
ডিউকের চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ডিউক অব ফেরারা কেবল একজন নিষ্ঠুর স্বামী নন, বরং তিনি এক জটিল মানসিক বিকারের প্রতিনিধি:
মালিকানা সত্তা (Possessiveness): ডিউকের কাছে প্রেম মানে সাহচর্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ। তিনি ডাচাসের প্রতিকৃতির সামনে একটি পর্দা লাগিয়ে রেখেছেন যাতে তিনি ছাড়া অন্য কেউ তাকে দেখতে না পারে। তিনি এমনকি মৃত স্ত্রীর সৌন্দর্যের ওপরও একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখতে চান।
তীব্র হীনম্মন্যতা ও অহংকার: অদ্ভুতভাবে, এত ক্ষমতার মালিক হওয়া সত্ত্বেও ডিউক ভেতরে ভেতরে অনিরাপদ বোধ করতেন। ডাচাস কেন অন্যের দিকে তাকিয়ে হাসতেন, তা নিয়ে তার মনে চরম ইর্ষা ছিল। তিনি নিচু হয়ে (Stooping) ডাচাসকে বোঝানো বা সংশোধন করা নিজের আভিজাত্যের অবমাননা বলে মনে করতেন।
নন্দনতাত্ত্বিক বিকার (Aesthetic Perversion): ডিউক একজন শিল্প সংগ্রাহক। তিনি ডাচাসকে একজন মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে পারেননি, কিন্তু শিল্পকর্ম হিসেবে তাকে উচ্চ মূল্য দিচ্ছেন। তার কাছে সৌন্দর্য তখনই সার্থক, যখন তা তার আলমারিতে বা দেয়ালে বন্দি থাকে।
নেপচুন ও ডিউক: একটি রূপক বিশ্লেষণ
কবিতার শেষে ডিউক দূতকে একটি ভাস্কর্য দেখান—"Notice Neptune, though, / Taming a sea-horse..."।
My Last Duchess' বুঝতে গেলে 'ড্রামাটিক মনোলগ' (Dramatic Monologue) বা 'নাটকীয় স্বগতোক্তি'র গঠনটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। রবার্ট ব্রাউনিং এই আঙ্গিকটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
একটি আদর্শ ড্রামাটিক মনোলগের তিনটি প্রধান স্তম্ভ থাকে, যা এই কবিতায় নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে:
১. একক বক্তা (A Single Speaker)
পুরো কবিতায় কেবল একজনই কথা বলেন। এখানে বক্তা হলেন ডিউক। আমরা ডাচাস বা দূতের কথা সরাসরি শুনতে পাই না। কিন্তু ডিউকের কথার মাধ্যমেই আমরা ডাচাসের চরিত্র এবং দূতের প্রতিক্রিয়া আঁচ করতে পারি। এটি অনেকটা একটি একতরফা টেলিফোন সংলাপের মতো।
২. নীরব শ্রোতা (A Silent Listener)
বক্তা একা কথা বললেও তিনি কিন্তু একা নন। তার সামনে একজন শ্রোতা উপস্থিত থাকেন। এই কবিতায় শ্রোতা হলেন পাশের রাজ্যের কাউন্টের দূত। শ্রোতা কোনো কথা না বললেও তার উপস্থিতি ডিউকের কথা বলার ভঙ্গি ও বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করে। যেমন— ডিউক যখন বলেন, "Will’t please you sit and look at her?", তখন বোঝা যায় দূত দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং ডিউক তাকে বসার অনুরোধ করছেন।
৩. নাটকীয় মুহূর্ত ও স্থান (A Dramatic Setting)
কবিতাটি একটি নির্দিষ্ট নাটকীয় মুহূর্তে শুরু হয়। এখানে ডিউক তার মৃত স্ত্রীর ছবি দেখিয়ে নতুন বিয়ের চুক্তি করতে যাচ্ছেন। এই পটভূমিটিই ডিউকের ভেতরের আসল রূপটি বের করে আনে।
ড্রামাটিক মনোলগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই শৈলীটির মূল জাদু হলো 'অনিচ্ছাকৃত আত্মপ্রকাশ' (Unintentional Revelation)।
মুখোশ উন্মোচন: ডিউক নিজেকে একজন অত্যন্ত মার্জিত, রুচিশীল এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চান। কিন্তু কথা বলতে বলতে তিনি অজান্তেই নিজের নিষ্ঠুরতা, ঈর্ষা এবং দাম্ভিকতা প্রকাশ করে ফেলেন।
বিচারের ভার পাঠকের ওপর: লেখক নিজে এখানে কোনো মন্তব্য করেন না। তিনি কেবল ডিউকের জবানবন্দিটি তুলে ধরেন। পাঠক নিজেই বিচারক হয়ে ওঠেন যে, ডিউক আসলে কতটা ভয়ানক।
'My Last Duchess' কবিতায় মনোলগের সার্থকতা
রবার্ট ব্রাউনিংয়ের 'My Last Duchess' কবিতায় 'যৌন চেতনা' বা Sexual Politics অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালীভাবে কাজ করে। ভিক্টোরীয় যুগের প্রেক্ষাপটে এই কবিতায় নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং যৌন ঈর্ষার (Sexual Jealousy) একটি অন্ধকার দিক ফুটে উঠেছে।
নিচে এই চেতনার প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ (Male Gaze & Control)
ডিউকের কাছে ডাচাস কোনো স্বাধীন সত্তা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ডিউকের একটি 'সম্পত্তি'। কবিতায় ডিউক যখন বলেন যে তিনি ছাড়া আর কেউ ডাচাসের ছবির পর্দা সরাতে পারে না ("none puts by / The curtain I have drawn for you, but I"), তখন বোঝা যায় তিনি ডাচাসের সৌন্দর্য এবং তার ওপর একচেটিয়া অধিকার বা 'যৌন মালিকানা' প্রতিষ্ঠা করতে চান। ডাচাস বেঁচে থাকতে তাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলেই তিনি তাকে হত্যা করে একটি 'স্থির চিত্রে' পরিণত করেছেন।
২. যৌন ঈর্ষা ও সন্দেহ (Sexual Jealousy)
ডিউকের অভিযোগ ছিল যে ডাচাস সবার দিকে তাকিয়ে হাসতেন। তিনি ডাচাসের হাসিকে কেবল সৌজন্য হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে এক ধরণের চারিত্রিক 'লঘুতা' হিসেবে সন্দেহ করেছেন।
"A heart—how shall I say?—too soon made glad, / Too easily impressed; she liked whate’er / She looked on, and her looks went everywhere."
এখানে "looks went everywhere" বাক্যাংশটি ডিউকের অবদমিত যৌন ঈর্ষার বহিঃপ্রকাশ। তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না যে অন্য কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে আনন্দ দিচ্ছে বা তার স্ত্রী অন্য কারো উপস্থিতিতে প্রফুল্ল বোধ করছেন।
৩. অবজেক্টিফিকেশন বা বস্তুকরণ (Objectification)
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে ডিউক ডাচাসকে একটি মানুষের চেয়ে একটি 'শিল্পবস্তু' হিসেবে দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নারীর রক্ত-মাংসের আবেগ বা তার স্বাধীন ইচ্ছা ডিউকের কাছে ভয়ের কারণ ছিল। তাই তিনি তাকে মেরে ফেলে একটি জড় মূর্তিতে রূপান্তর করেছেন, যাকে তিনি নিজের শোবার ঘরের দেয়ালে বন্দি করে রাখতে পারেন। এটি নারীর যৌনতা ও অস্তিত্বকে পুরুষের ইচ্ছাধীন করার একটি চরম রূপ।
৪. নেপচুন ও সী-হর্সের রূপক
কবিতার শেষে নেপচুন (পুরুষ শক্তি) কর্তৃক সমুদ্রঘোড়াকে (নারী সুলভ চপলতা বা স্বাধীনতা) বশ করার যে ভাস্কর্যটি ডিউক দেখান, সেটি আসলে তার নিজের অবদমিত কামনাবাসনা ও নিয়ন্ত্রণেরই প্রতীক। তিনি নারীকে ভালোবাসতে জানেন না, কেবল 'বশ' (Tame) করতে জানেন।
সংক্ষেপে যৌন চেতনার স্বরূপ:
নারীর শরীর ও হাসির ওপর নিয়ন্ত্রণ: ডিউকের মতে স্ত্রীর হাসি কেবল স্বামীর প্রাপ্য।
স্বাধীনতার অস্বীকৃতি: নারীর প্রাণচঞ্চলতাকে ডিউক 'অশ্লীল' বা 'মর্যাদাহানি' হিসেবে গণ্য করেছেন।
মালিকানা: স্ত্রীকে নিজের সংগ্রহের একটি দামি আসবাব বা গয়নার মতো গণ্য করা।
ব্রাউনিং এই কবিতার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, যখন প্রেম বা যৌন চেতনার সাথে 'অহংকার' ও 'মালিকানা বোধ' মিশে যায়, তখন তা কতটা ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হতে পারে।
অবশ্যই! রবার্ট ব্রাউনিংয়ের 'Porphyria’s Lover' কবিতাটি 'My Last Duchess'-এর এক অন্ধকার এবং আরও বেশি সরাসরি সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। এই দুটি কবিতার প্রেমিকেরাই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এবং দুজনেই তাদের প্রেমিকাকে চিরতরে 'নিজের' করে রাখার জন্য হত্যার পথ বেছে নেয়।
নিচে 'Porphyria’s Lover'-এর বিষয়বস্তু ও প্রেমিকের মানসিক বিকারের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. প্রেক্ষাপট ও কাহিনী (The Plot)
একটি ঝোড়ো রাতে পরফিরিয়া (Porphyria) তার প্রেমিকের কুটিরে আসে। সে ভিজে যাওয়া পোশাক ছেড়ে আগুন জ্বালায় এবং প্রেমিকের পাশে বসে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে। কিন্তু প্রেমিকের মনে এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ চিন্তা ভর করে। সে বুঝতে পারে যে এই মুহূর্তে পরফিরিয়া তাকে সম্পূর্ণভাবে ভালোবাসছে। এই 'মুহূর্ত'টিকে চিরস্থায়ী করার জন্য সে পরফিরিয়ার নিজের লম্বা সোনালী চুল দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
২. মানসিক বিকারের স্বরূপ (Psychological Derangement)
৩. 'My Last Duchess' বনাম 'Porphyria’s Lover' (তুলনা)
সামাজিক অবস্থান: 'My Last Duchess'-এর ডিউক একজন অভিজাত শাসক, যিনি আভিজাত্যের আড়ালে নিষ্ঠুর। অন্যদিকে, পরফিরিয়ার প্রেমিক একজন সাধারণ মানুষ, যার বিকার অনেক বেশি আদিম ও সরাসরি।
হত্যার ধরণ: ডিউক সরাসরি নিজে হত্যা করেননি, বরং 'নির্দেশ' দিয়েছিলেন। কিন্তু পরফিরিয়ার প্রেমিক নিজ হাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।
উদ্দেশ্য: ডিউকের উদ্দেশ্য ছিল 'সম্মান ও নিয়ন্ত্রণ', আর পরফিরিয়ার প্রেমিকের উদ্দেশ্য ছিল 'ভালোবাসাকে স্থির করে রাখা'।
৪. আধুনিক মনস্তত্ত্বে প্রভাব
এই কবিতাগুলো ভিক্টোরীয় যুগের তথাকথিত 'নিখুঁত প্রেম'-এর ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ব্রাউনিং দেখিয়েছেন যে প্রেমের আড়ালে কীভাবে চরম অ্যাবনরমাল সাইকোলজি (Abnormal Psychology) লুকিয়ে থাকতে পারে। আধুনিক থ্রিলার বা সাইকোলজিক্যাল মুভিগুলোতে আমরা যে 'অবসেসিভ লাভার' (Obsessive Lover) দেখি, তার আদি রূপ এই কবিতাগুলোতেই পাওয়া যায়।
ব্রাউনিংয়ের এই ছকভাঙা কবিতার আলোচনার পর, নারী-পুরুষ সম্পর্কের একটি ভিন্নধর্মী এবং অত্যন্ত গভীর মাত্রা আমরা পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'লিপিকা'র 'স্ত্রীর পত্র' বা তার বিখ্যাত কাব্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা'-তে।
ব্রাউনিং যেখানে 'মনস্তাত্ত্বিক বিকার' ও 'মালিকানা' দেখিয়েছেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন 'আত্মোপলব্ধি' ও 'ব্যক্তিত্বের মুক্তি'। নিচে সংক্ষেপে 'চিত্রাঙ্গদা'র একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করা হলো যা আপনার ভালো লাগতে পারে:
১. 'চিত্রাঙ্গদা' ও নারীর প্রকৃত সত্তা (The True Self)
ব্রাউনিংয়ের ডাচাস যেমন ডিউকের 'খামখেয়ালির' শিকার হয়েছিলেন, চিত্রাঙ্গদা সেখানে নিজের রূপ নিয়ে এক অনন্য লড়াই লড়েছেন।
বাহ্যিক রূপ বনাম অভ্যন্তরীণ গুণ: চিত্রাঙ্গদা অর্জুনকে জয় করার জন্য কৃত্রিমভাবে সুন্দর রূপ ধারণ করেন। কিন্তু পরে তিনি বুঝতে পারেন, অর্জুন যাকে ভালোবাসছেন তা কেবল এক 'মায়ার আবরণ'।
উক্তি: শেষ পর্যন্ত তিনি অর্জুনকে বলেন— "আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজকন্যা। নহি দেবী, নহি সামান্য নারী।" এখানে নারী কোনো 'বস্তু' নয়, বরং সে তার দোষ-গুণ নিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। এটি ব্রাউনিংয়ের ডিউকের ধারণার (যেখানে নারী কেবল একটি দেয়ালের ছবি) সম্পূর্ণ বিপরীত।
২. আধুনিক কবিতায় নারী-পুরুষের টানাপোড়েন
আপনি যদি জীবনানন্দ দাশের 'আট বছর আগের একদিন' কবিতাটি দেখেন, সেখানেও একধরণের অদ্ভুত মানসিক বিষণ্ণতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন পাওয়া যায়। ব্রাউনিংয়ের মতো সেখানেও 'মৃত্যু' ও 'প্রেম' এক হয়ে মিশে গেছে।
"বধু শুয়ে ছিল পাশে— শিশুটিও ছিল; / প্রেম ছিল, আশা ছিল— জ্যোৎস্নায়— তবুও সে দেখিল / কোন্ ভূত?"
ব্রাউনিংয়ের চরিত্ররা যেমন অন্যকে মেরে ফেলে শান্তি পায়, জীবনানন্দের এই চরিত্রটি নিজের ভেতরের শূন্যতা থেকে মুক্তি পেতে নিজেকেই শেষ করে দেয়।
৩. পাশ্চাত্য সাহিত্যে 'নারীবাদী' দৃষ্টিভঙ্গি
আপনি চাইলে ভার্জিনিয়া উলফ (Virginia Woolf) বা সিলভিয়া প্লাথ (Sylvia Plath)-এর কাজ নিয়েও আলোচনা করতে পারেন। সিলভিয়া প্লাথ-এর 'Daddy' কবিতায় তিনি পুরুষতান্ত্রিক শাসনের এমন এক চিত্র এঁকেছেন যা ব্রাউনিংয়ের ডিউকের নিষ্ঠুরতাকে মনে করিয়ে দেয়।
একটি তুলনামূলক ছক:
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা

0 Comments