পবিত্র কোরআনে নারীদের জন্য বিধান ও নারীদের জন্য সমাজের প্রতি বিধান


পবিত্র কোরআনে নারীদের জন্য বিধান ও নারীদের জন্য সমাজের প্রতি বিধান

পবিত্র কোরআনে নারী ও পুরুষকে আধ্যাত্মিক এবং মানবিক মর্যাদায় সমান স্থান দেওয়া হয়েছে। সমাজকে নারীর অধিকার, সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরাসরি নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। নিচে আরবি ও বাংলা অর্থসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরা হলো:
১. মানবিক ও আধ্যাত্মিক সমমর্যাদা
সমাজকে এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষের মর্যাদা কর্মের ওপর নির্ভরশীল, লিঙ্গের ওপর নয়।
 আরবি: فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِّنكُم مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ ۖ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ

 বাংলা অনুবাদ: "অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া কবুল করলেন যে, আমি তোমাদের মধ্যে কোনো কর্মকারীর কর্ম নষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী, তোমরা একে অপরের অংশ।" (সূরা আল-ইমরান: ১৯৫)

২. অর্থনৈতিক অধিকার (উত্তরাধিকার ও মালিকানা)
তৎকালীন অন্ধকার যুগে নারীদের সম্পদের অধিকার ছিল না। কোরআন সমাজকে নির্দেশ দিয়েছে নারীদের সম্পত্তিতে অংশ দিতে।

 আরবি: لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا

 বাংলা অনুবাদ: "পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন যা রেখে যান, তাতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজন যা রেখে যান তাতে নারীদেরও অংশ আছে; তা অল্পই হোক বা বেশি—এ এক নির্ধারিত অংশ।" (সূরা আন-নিসা: ৭)

৩. দম্পতি হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে কোরআনে এক অপরের "পোশাক" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা সুরক্ষা ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

 আরবি: هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ

 বাংলা অনুবাদ: "তারা (নারীরা) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা (পুরুষরা) তাদের পোশাক।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৭)

৪. সদাচরণ ও সহমর্মিতা
নারীদের সাথে কর্কশ আচরণ না করে বরং ধৈর্য ও সহমর্মিতার সাথে বসবাস করতে সমাজকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 আরবি: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

 বাংলা অনুবাদ: "এবং তোমরা তাদের (নারীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবন অতিবাহিত করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)

৫. কন্যা সন্তানের সম্মান
কোরআন কন্যা সন্তানকে অভিশাপ মনে করার জাহেলিয়াত বা অন্ধকার প্রথাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং তাদের জীবন রক্ষার অধিকার দিয়েছে।

আরবি: وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ

 বাংলা অনুবাদ: "যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে—কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?" (সূরা আত-তাকভীর: ৮-৯)
✨✨✨✨✨✨
কোরআনের এই আয়াতগুলো সমাজকে একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং সম্মানজনক কাঠামো প্রদান করে, যেখানে নারীর শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অবশ্যই, শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও ভূমিকা সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রগতিশীল এবং ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে এবং উপযুক্ত পরিবেশে কাজ করার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা (Education)
কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল "ইকরা" বা "পড়"। এই নির্দেশ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের জন্য ছিল না, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য।
 * বিবেচনাপ্রসূত আয়াত: 
আরবি: هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
    বাংলা অনুবাদ: "বলো, যারা জানে (শিক্ষিত) এবং যারা জানে না (অশিক্ষিত), তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা আয-যুমার: ৯)
   
 * দৃষ্টিভঙ্গি: কোরআন বারবার মানুষকে চিন্তা করতে, গবেষণা করতে এবং জ্ঞান অন্বেষণ করতে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশা (রা.) ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত ও শিক্ষক, যা প্রমাণ করে যে ইসলাম নারীকে শিক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে বাধা দেয় না, বরং উৎসাহিত করে।
২. কর্মক্ষেত্র ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা (Work & Financial Autonomy)
কোরআন নারীর উপার্জনকে তার নিজস্ব অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একজন নারী কাজ করে যা উপার্জন করবেন, তাতে তার বাবা বা স্বামীর কোনো অধিকার নেই যতক্ষণ না তিনি স্বেচ্ছায় তা প্রদান করেন।
 * কোরআনের বার্তা:
    আরবি: لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ
    বাংলা অনুবাদ: "পুরুষ যা অর্জন করবে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করবে তা তার প্রাপ্য অংশ।" (সূরা আন-নিসা: ৩২)
    
 * কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ: ইসলাম নারীকে পর্দার ও শালীনতার বিধান মেনে সমাজ সংস্কার, চিকিৎসা, শিক্ষা বা ব্যবসার মতো কাজে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়। ইসলামের ইতিহাসে উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী এবং হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে শাফা বিনতে আবদুল্লাহকে বাজারের পরিদর্শক (Market Inspector) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
৩. সামাজিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা
কোরআনে রানী বিলকিসের (সাবার রানী) উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে তার রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যদি কোনো নারী যোগ্য হন, তবে তিনি নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারেন।
সংক্ষেপে কোরআনের মূলনীতি:
১. শ্রমের মর্যাদা: নারী হোক বা পুরুষ, প্রত্যেকের ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহ সমানভাবে দেবেন (সূরা আন-নাহল: ৯৭)।
২. নিরাপত্তা: কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব।
৩. ভারসাম্য: কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের পাশাপাশি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সামাজিক কাঠামো সুদৃঢ় থাকে।
 উত্তরাধিকার আইন এবং পরিবার পরিচালনায় নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কোরআনের আলোকে এই বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. উত্তরাধিকার আইন (Law of Inheritance)
পবিত্র কোরআনে উত্তরাধিকার বন্টনের বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি অধিকার নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নির্ধারিত "ফরজ" বা অবশ্যপালনীয় বিধান।
 * বিবেচনাপ্রসূত আয়াত:
    
আরবি: لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ...
    
বাংলা অনুবাদ: "পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে..." (সূরা আন-নিসা: ৭)
   
 * দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলামি আইনে নারী বিভিন্ন অবস্থায় উত্তরাধিকার পায় (যেমন: কন্যা, মা, স্ত্রী বা বোন হিসেবে)। যদিও কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ নারীর দ্বিগুণ পায়, তার কারণ হলো ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণের আর্থিক দায়িত্ব কেবল পুরুষের ওপর ন্যস্ত। নারীর প্রাপ্ত সম্পত্তি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব, যা তাকে কোনো খরচ ছাড়াই অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করে।
২. পরিবার পরিচালনায় নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা
পরিবার একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সমতুল্য, যেখানে নারীর ভূমিকা কেবল সেবিকা হিসেবে নয়, বরং একজন "পরামর্শদাতা" ও "ব্যবস্থাপক" হিসেবে স্বীকৃত।
 * পারস্পরিক পরামর্শ (Shura): কোরআনে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারস্পরিক পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
   
 আরবি: ...وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ...
   
বাংলা অনুবাদ: "...এবং তাদের (মুমিনদের) কার্যাবলী সম্পাদিত হয় পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে।" (সূরা আশ-শূরা: ৩৮)
   
 * সন্তান লালন-পালন ও গৃহ পরিচালনা: সূরা আল-বাকারাহ (আয়াত: ২৩৩)-এ বলা হয়েছে যে, সন্তানের দুধ ছাড়ানোর মতো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত বাবা-মা উভয়ের পারস্পরিক সম্মতি ও পরামর্শের ভিত্তিতে হতে হবে। এটি প্রমাণ করে যে মা বা স্ত্রীর মতামত ছাড়া একক কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কোরআনের মূলনীতির পরিপন্থী।
 * মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে আমরা দেখি তিনি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি বা যুদ্ধের সময়ও তাঁর স্ত্রীদের (যেমন—উম্মে সালামা রা.) পরামর্শ নিতেন এবং তা বাস্তবায়ন করতেন।
মূল শিক্ষা
কোরআনের এই বিধানগুলো সমাজকে শিক্ষা দেয় যে, নারী কেবল একটি পরিবারের অংশ নয়, বরং তিনি পরিবারের একজন নীতিনির্ধারক এবং স্বতন্ত্র সম্পদের অধিকারী। ধন্যবাদ। আব্দুল মুসরেফ খাঁন Abdul Musref Khan       
ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করেন। পাঁশকুড়া আমার শহর-Panskura   আমাদের শিক্ষার প্রয়োজন আছে।।


📌 Click Icon সাবস্ক্রাইব করুন


Click Topics and Read Thank you visit again 



















19.

20.

Post a Comment

0 Comments