Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
জোনাথন সুইফট-এর লেখা ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ (Gulliver's Travels) ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক (Satire) উপন্যাস। ১৭২৬ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে লেমুয়েল গালিভার নামের এক জাহাজের ডাক্তারের চারটি রোমাঞ্চকর ও অদ্ভুত ভ্রমণের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
নিচে বইটির মূল বিষয়বস্তু বা কাহিনী সংক্ষেপ আলোচনা করা হলো:
১. লিলিপুট ভ্রমণ (লিলিপুট দ্বীপ)
গালিভারের প্রথম যাত্রা শুরু হয় লিলিপুট দ্বীপে, যেখানে মানুষের উচ্চতা মাত্র ৬ ইঞ্চি।
মূল ঘটনা: জাহাজডুবির পর গালিভার এই দ্বীপে পৌঁছান। লিলিপুটরা তাকে বন্দী করলেও পরে তার বিশালত্বের কারণে তাকে সামরিক কাজে ব্যবহার করতে চায়।
ব্যঙ্গ: এখানে সুইফট তৎকালীন ইংল্যান্ডের তুচ্ছ রাজনৈতিক দলাদলি এবং মানুষের অহংকারকে ব্যঙ্গ করেছেন। যেমন—ডিম কোন দিক দিয়ে ভাঙতে হবে (সরু না মোটা অংশ), এই নিয়ে লিলিপুটদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও অন্য দেশের সাথে বিবাদ লেগে থাকে।
২. ব্রবডিংনাগ ভ্রমণ (দৈত্যদের দেশ)
দ্বিতীয় যাত্রায় গালিভার পৌঁছান ব্রবডিংনাগ দ্বীপে, যেখানে সবকিছুই বিশাল। এখানকার মানুষগুলো প্রায় ৬০ ফুট লম্বা।
মূল ঘটনা: এখানে গালিভার নিজেই লিলিপুটে পরিণত হন। এক কৃষক তাকে খুঁজে পায় এবং মেলায় প্রদর্শন করে টাকা কামায়। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজপ্রাসাদে ঠাঁই পান।
ব্যঙ্গ: গালিভার যখন গর্ব করে ইউরোপের রাজনীতি ও যুদ্ধের কথা বলেন, তখন দৈত্যকার রাজা অবাক হয়ে বলেন যে মানুষ জাতি সম্ভবত পৃথিবীর নিকৃষ্টতম প্রাণী। এখানে মানুষের নৈতিক ক্ষুদ্রতাকে তুলে ধরা হয়েছে।
৩. লাপুটা, ব্যালনিবার্বি ও অন্যান্য
তৃতীয় যাত্রায় গালিভার একটি উড়ন্ত দ্বীপে (লাপুটা) পৌঁছান।
মূল ঘটনা: এখানকার মানুষরা গণিত এবং সঙ্গীতে মগ্ন থাকলেও বাস্তব জ্ঞানহীন। তারা অবাস্তব ও অদ্ভুত সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে (যেমন: শসা থেকে সূর্যের আলো বের করা)।
ব্যঙ্গ: সুইফট এখানে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন বিজ্ঞানীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
৪. হুয়াইনহাম ও ইয়াু ভ্রমণ
এটি গালিভারের শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ।
মূল ঘটনা: গালিভার এমন এক দেশে পৌঁছান যেখানে ঘোড়ারা (হুয়াইনহাম) অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সুসভ্য এবং মানুষরা (ইয়াু) পশুদের মতো অসভ্য ও নোংরা।
ব্যঙ্গ: ঘোড়াদের কাছে মানুষের নিচতা দেখে গালিভার লজ্জিত হন। নিজের দেশে ফিরে এসে তিনি আর সাধারণ মানুষের সাথে মিশতে পারতেন না, এমনকি নিজের পরিবারকেও তার অসহ্য লাগত। এটি মানুষের স্বভাবের এক চরম নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।
মূল উপজীব্য বিষয়
‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ কেবল ছোটদের রূপকথা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমালোচনা। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
মানুষের অহংকার এবং নিষ্ঠুরতাকে উন্মোচিত করা।
রাজনীতির তুচ্ছতা এবং ধর্মের নামে মারামারিকে ব্যঙ্গ করা।
মানুষের পশুতুল্য আচরণকে চিনিয়ে দেওয়া।
হ্যাঁ, অবশ্যই! 'গালিভার্স ট্রাভেলস'-এর গভীরতা বুঝতে হলে এর কয়েকটি বিশেষ দিক বিশ্লেষণ করা জরুরি। আপনি চাইলে নিচের যেকোনো একটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারি:
১. লেমুয়েল গালিভার চরিত্রের বিবর্তন
গালিভার কি শুধুই একজন পর্যটক? গল্পের শুরুতে তিনি ছিলেন একজন কৌতূহলী এবং দেশপ্রেমিক ইংরেজ। কিন্তু চারটি ভ্রমণের শেষে তার মানসিকতায় এক চরম পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে চতুর্থ ভ্রমণের পর তিনি মানুষকে ঘৃণা করতে শুরু করেন (Misanthropy)। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণগুলো বেশ চমৎকার।
২. রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ (Political Satire)
সুইফট এই বইয়ে সরাসরি তৎকালীন ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে (যেমন: Whigs এবং Tories) আক্রমণ করেছেন।
লিলিপুটের হাই-হিল বনাম লো-হিল: এটি ছিল রাজনৈতিক দলাদলির প্রতীক।
ডিম ভাঙার বিবাদ: এটি ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের বিবাদের প্রতীক।
৩. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমালোচনা (লাপুটা পর্ব)
তৃতীয় খণ্ডে সুইফট সেই সময়ের 'রয়্যাল সোসাইটি'-র বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন। কেন তিনি মনে করতেন যে তাত্ত্বিক বিজ্ঞান মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারছে না?
৪. হুয়াইনহাম (Houyhnhnms) বনাম ইয়াু (Yahoos)
এটি বইয়ের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ। ঘোড়ারা যেখানে যুক্তিবাদী এবং সুসভ্য, সেখানে মানুষ (ইয়াু) কেন পশুর মতো নোংরা? সুইফট কি সত্যিই মনে করতেন মানুষ পশুর চেয়েও অধম?
'গালিভার্স ট্রাভেলস'-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং বিতর্কিত দিকটি হলো এর শেষ অধ্যায় বা চতুর্থ ভ্রমণ। গালিভারের চরিত্রের এই আমূল পরিবর্তন এবং 'ইয়াু' ও 'হুয়াইনহাম'-এর প্রতীকী লড়াই নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. লেমুয়েল গালিভার: একজন দেশপ্রেমিক থেকে মানুষবিদ্বেষী (Misanthrope)
গল্পের শুরুতে গালিভার ছিলেন একজন সাধারণ, ভদ্র এবং কিছুটা সাদাটে হৃদয়ের ইংরেজ ডাক্তার। তিনি যখন লিলিপুট বা ব্রবডিংনাগ ভ্রমণে যান, তখন তিনি বারবার ইংল্যান্ডের আইন, বিচারব্যবস্থা এবং রাজপরিবারের গুণগান গেয়েছেন। কিন্তু চতুর্থ ভ্রমণে হুয়াইনহামদের (বুদ্ধিমান ঘোড়া) সংস্পর্শে এসে তার চোখ খুলে যায়।
বিবর্তন: তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি যাকে 'সভ্যতা' ভাবতেন, তা আসলে লোভ, হিংসা আর মিথ্যার আবরণ মাত্র।
পরিণতি: ভ্রমণের শেষে তিনি যখন ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন, তখন তিনি নিজের স্ত্রী ও সন্তানদেরও আর সহ্য করতে পারতেন না। মানুষের গায়ের গন্ধ তার কাছে পশুর মতো লাগত। তিনি আস্তাবলে গিয়ে ঘোড়াদের সাথে সময় কাটানো শুরু করেন। সুইফট এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষ যখন সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন সে তার নিজের প্রজাতির নিচতা দেখে আর স্থির থাকতে পারে না।
২. ইয়াু (Yahoos) বনাম হুয়াইনহাম (Houyhnhnms)
এটি বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী অংশ। এখানে সুইফট মানুষের অস্তিত্বকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন:
৩. রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতীকী অর্থ (লিলিপুটের ডিম ভাঙার যুদ্ধ)
আপনি যদি লিলিপুটের সেই 'ডিম ভাঙার যুদ্ধ' বা Big-Endians বনাম Little-Endians-এর কথা ভাবেন, তবে দেখবেন সুইফট সেখানে কত বড় সত্য লুকিয়ে রেখেছিলেন:
ডিম ভাঙার বিবাদ: লিলিপুটরা বিশ্বাস করত ডিম ভাঙতে হবে সরু অংশ দিয়ে, কিন্তু তাদের বিরোধী দেশ ব্লেফুস্কু মনে করত মোটা অংশ দিয়ে। এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়।
প্রতীক: এটি ছিল আসলে ইংল্যান্ডের ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের বিবাদের একটি প্রতীকী রূপ। সুইফট বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষ ধর্মের সারমর্ম বাদ দিয়ে তুচ্ছ নিয়মকানুন নিয়ে একে অপরের প্রাণ নিতেও দ্বিধা করে না।
জুতো ও রাজনীতি: লিলিপুটদের রাজনীতি ভাগ ছিল জুতোর হিল নিয়ে। উঁচু হিল (High-heels) এবং নিচু হিল (Low-heels) পন্থীরা একে অপরকে ঘৃণা করত। এটি ছিল তৎকালীন ব্রিটেনের Whig এবং Tory নামক দুটি রাজনৈতিক দলের ব্যঙ্গচিত্র।
লিলিপুটদের সেই অদ্ভুত রাজনৈতিক বিবাদ এবং জুতোর হিল নিয়ে তাদের সংঘাতের বিষয়টি জোনাথন সুইফটের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক রসবোধের এক অনন্য উদাহরণ। আপনি যদি এই বিবাদের গভীরে যান, তবে দেখবেন কীভাবে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
নিচে লিলিপুটদের সেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিবাদের দুটি প্রধান উদাহরণ দেওয়া হলো:
১. ট্রামেক্সান ও স্লামেক্সান (উঁচু হিল বনাম নিচু হিল)
লিলিপুটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দুটি দলে বিভক্ত ছিল, যাদের পার্থক্য ছিল শুধুমাত্র তাদের জুতোর হিলের উচ্চতায়:
ট্রামেক্সান (Tramecksan): এরা ছিল উঁচু হিলের সমর্থক। তারা রক্ষণশীল এবং প্রাচীন ঐতিহ্যে বিশ্বাসী (এটি তৎকালীন ইংল্যান্ডের Tory দলের প্রতীক)।
স্লামেক্সান (Slamecksan): এরা ছিল নিচু হিলের সমর্থক। রাজা নিজে এই দলের অনুসারী ছিলেন এবং কেবল নিচু হিল পরা ব্যক্তিদেরই সরকারি উচ্চপদে নিয়োগ দিতেন (এটি Whig দলের প্রতীক)।
মজার উদাহরণ: রাজপুত্রের অবস্থা ছিল আরও অদ্ভুত। তিনি কোনো এক দলকে চটিয়ে দিতে চাননি, তাই তিনি এক পায়ে উঁচু হিলের জুতো এবং অন্য পায়ে নিচু হিলের জুতো পরতেন! ফলে হাঁটার সময় তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতেন।
২. ডিম ভাঙার বিবাদ (বিগ-এন্ডিয়ান বনাম লিটল-এন্ডিয়ান)
এটি ছিল লিলিপুট এবং তাদের প্রতিবেশী দেশ ব্লেফুস্কু-র (Blefuscu) মধ্যে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের মূল কারণ।
বিবাদ: প্রাচীনকাল থেকেই লিলিপুটরা ডিমের মোটা অংশ (Big-end) দিয়ে ডিম ভাঙত। কিন্তু বর্তমান রাজার দাদামশাই যখন ছোট ছিলেন, তখন ডিম ভাঙতে গিয়ে তার আঙুল কেটে যায়। এরপর তার বাবা (তৎকালীন রাজা) আদেশ দেন যে সবাইকে ডিমের সরু অংশ (Little-end) দিয়ে ডিম ভাঙতে হবে।
বিদ্রোহ: এই আদেশের ফলে দেশে বিদ্রোহ দেখা দেয়। যারা মোটা অংশ দিয়ে ডিম ভাঙার পক্ষে ছিল (Big-Endians), তারা পালিয়ে ব্লেফুস্কু দেশে আশ্রয় নেয় এবং দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়।
সুইফটের সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতি: বইটিতে গালিভার উল্লেখ করেছেন যে, এই বিবাদের কারণে প্রায় ১১,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং শত শত জাহাজ ধ্বংস হয়েছে। সুইফট এর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষ যখন ধর্মের মূল শিক্ষা ভুলে গিয়ে তুচ্ছ আচার-আচরণ নিয়ে বিবাদে জড়ায়, তখন তা কতটা হাস্যকর ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
এই বিবাদের ফলাফল
গালিভার যখন এই বিবাদে জড়াতে অস্বীকার করেন এবং ব্লেফুস্কু-র নৌবহর ধ্বংস করার পর আর কোনো ক্ষতি করতে চাননি, তখন লিলিপুটের রাজা তার ওপর ক্ষিপ্ত হন। এটিই ছিল গালিভারের লিলিপুট ত্যাগের অন্যতম কারণ।
গালিভার্স ট্রাভেলস'-এর আসল মজাটা এখানেই—এটি কেবল একটি কাল্পনিক গল্প নয়, বরং তৎকালীন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের একটি নিখুঁত প্রতিফলন। জোনাথন সুইফট ছদ্মনামে এই বইটি লিখেছিলেন কারণ এর রাজনৈতিক সমালোচনা ছিল অত্যন্ত তীব্র।
নিচে লিলিপুটদের বিবাদের সাথে তৎকালীন ইংল্যান্ডের আসল ইতিহাসের প্রধান মিলগুলো তুলে ধরা হলো:
১. হুইগ বনাম টোরি (Whigs vs Tories)
লিলিপুটের 'উঁচু হিল' (High-heels) এবং 'নিচু হিল' (Low-heels) পন্থীরা ছিল সরাসরি ইংল্যান্ডের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতীক।
টোরি (Tories): এরা ছিল উঁচু হিল বা 'ট্রামেক্সান'। তারা চার্চ এবং রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যে বিশ্বাসী ছিল।
হুইগ (Whigs): এরা ছিল নিচু হিল বা 'স্লামেক্সান'। সুইফটের সময়ে হুইগরা ক্ষমতায় ছিল এবং তারা রাজার অত্যন্ত অনুগত ছিল।
রাজপুত্রের হাঁটা: ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রিন্স অফ ওয়েলস (পরবর্তীতে দ্বিতীয় জর্জ) দুই দলের সাথেই সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতেন, যা সুইফট তার খুঁড়িয়ে হাঁটার মাধ্যমে ব্যঙ্গ করেছেন।
২. প্রোটেস্ট্যান্ট বনাম ক্যাথলিক (ধর্মীয় সংঘাত)
ডিম ভাঙার সেই অদ্ভুত যুদ্ধটি ছিল আসলে অ্যাংলিকান (প্রোটেস্ট্যান্ট) এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপক।
লিটল-এন্ডিয়ান (Little-Endians): এরা ইংল্যান্ডের প্রোটেস্ট্যান্টদের প্রতীক, যারা রাজার আদেশে চার্চের নিয়মে পরিবর্তন এনেছিল।
বিগ-এন্ডিয়ান (Big-Endians): এরা ছিল ক্যাথলিকদের প্রতীক। তারা মনে করত পুরোনো নিয়ম (মোটা অংশ দিয়ে ডিম ভাঙা) পরিবর্তন করা পাপ।
৩. ব্লেফুস্কু ও ফ্রান্সের শত্রুতা
লিলিপুটের প্রতিবেশী দেশ ব্লেফুস্কু ছিল আসলে তৎকালীন ফ্রান্সের প্রতীক।
ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যে তখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলছিল (War of the Spanish Succession)।
বিগ-এন্ডিয়ানরা যেমন ব্লেফুস্কুতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল, তেমনি ইংল্যান্ডের অনেক ক্যাথলিক ও ক্ষমতাচ্যুত টোরি নেতারা ফ্রান্সে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক রেফারেন্স
গালিভার যেভাবে ব্লেফুস্কু-র নৌবহর একাই টেনে নিয়ে এসেছিলেন, সেটি তৎকালীন ইংরেজ নৌ-সেনাপতিদের বীরত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে লিলিপুটের রাজা যখন পুরো ব্লেফুস্কু দখল করতে চান এবং গালিভার তাতে রাজি হন না, তখন রাজদরবারে গালিভারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এটি ছিল তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা লর্ড বোলিংব্রোকের (Lord Bolingbroke) জীবনের প্রতিচ্ছবি, যাকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
আপনি কি জানেন?
সুইফট যখন এই অংশগুলো লিখছিলেন, তখন তাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়েছিল। কারণ সরাসরি রাজাকে বা সরকারকে ব্যঙ্গ করা তখন গুরুতর অপরাধ ছিল। এই কারণেই তিনি মানুষের বদলে 'লিলিপুট' বা 'বামন' চরিত্র ব্যবহার করেছিলেন যাতে মনে হয় এটি একটি রূপকথা।
গালিভারের তৃতীয় ভ্রমণ অর্থাৎ 'লাপুটা' (Laputa) ভ্রমণটি জোনাথন সুইফটের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য প্রকাশ। এই অংশটি মূলত তৎকালীন ইংল্যান্ডের 'রয়্যাল সোসাইটি' এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি চরম বিদ্রূপ।
নিচে লাপুটা দ্বীপ এবং সেখানকার অদ্ভুত সব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. লাপুটা: উড়ন্ত দ্বীপ
লাপুটা হলো একটি বিশাল বৃত্তাকার দ্বীপ যা চুম্বকীয় শক্তির সাহায্যে আকাশে ভেসে থাকে।
মানুষের বর্ণনা: এখানকার মানুষরা সবসময় গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। তাদের একটি চোখ উপরের দিকে এবং অন্যটি ভেতরের দিকে ঘোরানো। তারা এতটাই অন্যমনস্ক যে, কথা বলার জন্য তাদের সাথে একজন 'ফ্ল্যাপার' (Flapper) থাকে। এই ফ্ল্যাপারের কাজ হলো একটি লাঠির মাথায় ফোলানো থলি দিয়ে মনিবের কানে বা মুখে মৃদু আঘাত করা, যাতে সে বাস্তবে ফিরে এসে কথা শুনতে বা বলতে পারে।
আগ্রহ: তারা কেবল গণিত এবং সঙ্গীত নিয়ে পড়ে থাকে। তাদের খাবারগুলোও জ্যামিতিক আকারে (যেমন: রম্বস আকৃতির মাংস বা ত্রিভুজাকৃতির রুটি) কাটা হয়।
২. ল্যাগাডো-র অদ্ভুত একাডেমি (Academy of Lagado)
গালিভার যখন নিচের শহর 'ল্যাগাডো'-তে নামেন, সেখানে তিনি একটি বৈজ্ঞানিক একাডেমি পরিদর্শন করেন। এখানকার বিজ্ঞানীরা (যাদের সুইফট 'প্রজেক্টর' বলেছেন) বছরের পর বছর ধরে এমন সব প্রকল্পে কাজ করছেন যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অদ্ভুত পরীক্ষা:
শসা থেকে সূর্যের আলো: একজন বিজ্ঞানী গত আট বছর ধরে চেষ্টা করছেন শসা থেকে সূর্যের আলো বের করে তা বোতলে বন্দি করতে, যাতে শীতকালে ঘর গরম রাখা যায়!
বরফ থেকে গানপাউডার: বরফকে পুড়িয়ে গানপাউডার বা বারুদ তৈরির চেষ্টা।
রেশম গুটি ছাড়া মাকড়সা: মাকড়সাকে রঙিন মাছি খাইয়ে রঙিন রেশম সুতো তৈরির পরীক্ষা।
মল থেকে খাদ্য উৎপাদন: মানুষের বিষ্ঠা বা মলকে আবার খাদ্যে রূপান্তর করার গবেষণা।
অন্ধদের জন্য রং চেনা: অন্ধ মানুষদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে রঙের পার্থক্য বোঝা যায়।
৩. ভাষার সংস্কার ও বই লেখার যন্ত্র
ল্যাগাডোর বিজ্ঞানীরা ভাষা নিয়েও অদ্ভুত সব গবেষণা করছিলেন:
শব্দহীন ভাষা: তারা ভাবলেন শব্দ উচ্চারণ করলে ফুসফুসের ক্ষয় হয়। তাই তারা স্থির করলেন কথা বলার বদলে পিঠে একটি ব্যাগে সব প্রয়োজনীয় জিনিস বয়ে বেড়াবেন। যখন যা বোঝাতে হবে, ব্যাগ থেকে সেই জিনিসটি বের করে দেখাবেন।
বই লেখার যন্ত্র: একটি বিশাল ফ্রেমের মধ্যে হাজার হাজার ছোট কাঠের টুকরোয় শব্দ লেখা থাকত। লিভার ঘুরিয়ে সেই শব্দগুলো এলোমেলোভাবে সাজানো হতো। যদি কোনো অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি হতো, তবে ছাত্ররা তা লিখে নিত। এভাবেই তারা কোনো জ্ঞান ছাড়াই দর্শন বা বিজ্ঞানের বই লিখতে চাইত।
৪. ব্যঙ্গ বা স্যাটেয়ারের উদ্দেশ্য
সুইফট এই অংশের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে:
বাস্তববর্জিত জ্ঞান: বিজ্ঞান যদি মানুষের সাধারণ অভাব পূরণ করতে না পারে, তবে সেই তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্থহীন।
বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা: যারা সবসময় বড় বড় তত্ত্বে ডুবে থাকে কিন্তু নিজের ঘর মেরামতের জ্ঞান রাখে না, তাদের তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। লাপুটার রাজপ্রাসাদের দেওয়ালগুলো ছিল বাঁকা কারণ রাজমিস্ত্রিরা জ্যামিতিক মাপ ঠিক রাখতে গিয়ে বাস্তব বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিল।
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা
36. Samuel Beckett: Waiting for Godot: বিষয়বস্তু
37. George Orwell: 1984, Animal Farm: বিষয়বস্তু
উপসংহার
সুইফট দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষ নিজেকে অনেক উন্নত এবং বুদ্ধিমান দাবি করলেও, আসলে তারা ইয়াু-দের মতোই নিচ, যদি না তারা তাদের যুক্তিবোধকে কাজে লাগায়। গালিভারের চরিত্রের এই ট্র্যাজেডি আমাদের শেখায় যে, নিজের জাতির ত্রুটিগুলো মেনে নেওয়া অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
.png)
0 Comments