James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
জেমস জয়েস-এর 'ইউলেসিস' (Ulysses) কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের এক বিশাল মহাকাব্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি উপন্যাসের গতানুগতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। হোমারের 'ওডিসি' (Odyssey)-র কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এটি আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন একঘেয়েমি এবং মহাকাব্যিক সংকটের এক অদ্ভুত কোলাজ।
নিচে এর বিষয়বস্তু এবং প্রভাব আলোচনা করা হলো:
১. বিষয়বস্তু: একদিনের আধুনিক ওডিসি
এই উপন্যাসের পুরো ঘটনাটি ১৯০৪ সালের ১৬ই জুন (যা এখন 'Bloomsday' নামে পরিচিত) আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে ঘটে।
তিনটি প্রধান চরিত্র: 1. লিওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom): তিনি উপন্যাসের আধুনিক 'ইউলেসিস'। একজন বিজ্ঞাপন সংগ্রাহক, যিনি ডাবলিনের রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতীক। 2. স্টিফেন ডেডালাস (Stephen Dedalus): একজন তরুণ কবি ও বুদ্ধিজীবী, যিনি আধ্যাত্মিক এবং বৌদ্ধিক পিতার সন্ধান করছেন। 3. মলি ব্লুম (Molly Bloom): ব্লুমের স্ত্রী, যিনি উপন্যাসের শেষে এক দীর্ঘ 'চেতনাস্রোত' (Stream of Consciousness)-এর মাধ্যমে তার মনের গভীরতম কথাগুলো প্রকাশ করেন।
কাঠামো: জয়েস হোমারের মহাকাব্যের পর্বগুলোর সাথে মিল রেখে উপন্যাসের অধ্যায়গুলো সাজিয়েছেন। তবে এখানে কোনো দানব বা দেবতা নেই; বরং ডাবলিনের সরাইখানা, শ্মশান, লাইব্রেরি এবং রাস্তাঘাটই হলো আধুনিক জীবনের রণক্ষেত্র।
শৈলী: এই উপন্যাসে জয়েস প্রতিটি অধ্যায়ে আলাদা শৈলী ব্যবহার করেছেন। কোথাও তা নাটকের মতো, কোথাও সংবাদের মতো, আবার কোথাও মানুষের অবচেতন মনের অগোছালো চিন্তার মতো।
২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
'ইউলেসিস' পাশ্চাত্য সাহিত্যকে এক ধাক্কায় কয়েক দশক এগিয়ে দিয়েছিল:
আধুনিকতাবাদের শিখর: এই উপন্যাসের মাধ্যমেই 'চেতনাস্রোত' পদ্ধতিটি তার পূর্ণতা পায়। স্যামুয়েল বেকেট, উইলিয়াম ফকনার থেকে শুরু করে সালমান রুশদি পর্যন্ত সবাই জয়েসের এই ভাষাশৈলীর কাছে ঋণী।
সেন্সরশিপ ও স্বাধীনতা: প্রকাশের পর এই বইটি অশ্লীলতার দায়ে দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এটি প্রকাশের অনুমতি পায়, যা সাহিত্যিক বাক-স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে।
নৈর্ব্যক্তিকতা: জয়েস দেখিয়েছেন যে মানুষের সবচেয়ে তুচ্ছ এবং 'অশ্লীল' চিন্তাও সাহিত্যের অংশ হতে পারে।
৩. প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব (বিশেষত বাংলা সাহিত্য)
জয়েসের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে সরাসরি উপন্যাসের চেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে:
কল্লোল ও পরবর্তী যুগ: ১৯৩০-৪০ এর দশকের বাঙালি লেখক গোষ্ঠী (যেমন—মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু) জয়েসের এই জটিল মনস্তত্ত্বের দ্বারা দারুণভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরীক্ষা: মানিকের 'চতুষ্কোণ' বা **'সহরতলী'**র মতো উপন্যাসে যে ধরণের নগরজীবন এবং মানুষের অন্তর্নিহিত জটিলতা দেখা যায়, তাতে জয়েসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে জয়েস ছিলেন অনেক বেশি বর্ণনামূলক, যেখানে মানিক ছিলেন বৈজ্ঞানিক।
অমিয় চক্রবর্তী ও আধুনিক কবিতা: কেবল গদ্যে নয়, কবিতার ভাষা ও ছন্দে যে 'অসংলগ্নতা' বা ভাঙা গড়া দেখা যায়, তাতেও 'ইউলেসিস'-এর একটা পরোক্ষ প্রভাব ছিল।
উত্তর-আধুনিক বাংলা কথাশিল্প: বর্তমানে দেবেশ রায় বা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় যে ধরণের ভাষাগত নিরীক্ষা দেখা যায়, তার শেকড় জয়েসের সেই ডাবলিন ভ্রমণের মধ্যেই নিহিত।
'ইউলেসিস' পড়া কোনো সহজ কাজ নয়, কারণ জয়েস চেয়েছিলেন পাঠক যেন এই বইটির সাথে লড়াই করে এর মর্মার্থ উদ্ধার করে। এটি আধুনিক জীবনের সেই আয়না, যেখানে মানুষের মহত্ত্ব এবং ক্ষুদ্রতা—দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে।
মলি ব্লুমের স্বগতোক্তি (Molly Bloom's Soliloquy) নিয়ে আলোচনা না করলে 'ইউলেসিস' অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি উপন্যাসের ১৮ নম্বর বা শেষ অধ্যায়, যার নাম 'পেনিলোপি' (Penelope)। জয়েসের এই রচনাটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সাহসী এবং বিতর্কিত অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
নিচে এই স্বগতোক্তির বিশেষত্বগুলো আলোচনা করা হলো:
১. লিখনশৈলী: যতিহীন চিন্তার ধারা
মলি ব্লুমের এই অংশটি জয়েসের 'চেতনাস্রোত' (Stream of Consciousness) পদ্ধতির চরম সার্থকতা।
বিরামচিহ্নের অভাব: প্রায় ৪০ হাজার শব্দের এই দীর্ঘ অংশে কোনো কমা, সেমিকোলন বা পূর্ণচ্ছেদ নেই বললেই চলে। এটি মূলত আটটি বিশাল বাক্যের সমষ্টি।
কেন এই শৈলী? জয়েস চেয়েছিলেন মানুষের অবচেতন মনের সেই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহকে ধরতে, যা ঘুমের আগে বা আধো-ঘুমের ঘোরে আমাদের মাথায় খেলা করে। চিন্তাগুলো এখানে একটির পর একটি ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে, কোনো ব্যাকরণ বা সামাজিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে।
২. বিষয়বস্তু: নারীর মনস্তত্ত্ব ও জৈবিক সত্য
মলি ব্লুম বিছানায় শুয়ে আধো-তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তার জীবনের ফেলে আসা দিনগুলো এবং বর্তমানের সম্পর্ক নিয়ে ভাবছেন।
কামনা ও প্রেম: তিনি তার স্বামী লিওপোল্ড ব্লুম এবং তার প্রেমিক ব্লেজেস বয়লানের (Blazes Boylan) কথা ভাবছেন। এখানে কোনো লুকোছাপা নেই; মলি তার শারীরিক চাহিদা, ঋতুস্রাব এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে চিন্তা করেন।
আধুনিক পেনিলোপি: হোমারের মহাকাব্যে 'পেনিলোপি' ছিলেন সতীত্বের প্রতীক। জয়েস এখানে মলিকে একজন রক্ত-মাংসের সাধারণ নারী হিসেবে এঁকেছেন, যার মধ্যে দোষ-গুণ, কামনা ও মমতা—সবই আছে।
৩. শেষ শব্দ: 'Yes' (হ্যাঁ)
এই দীর্ঘ স্বগতোক্তির একদম শেষে মলি তার যৌবনের স্মৃতিতে ফিরে যান, যখন লিওপোল্ড ব্লুম তাকে প্রথমবার প্রেম নিবেদন করেছিলেন।
"...and then I asked him with my eyes to ask again yes and then he asked me would I yes to say yes my mountain flower and first I put my arms around him yes and drew him down to me so he could feel my breasts all perfume yes and his heart was going like mad and yes I said yes I will Yes."
তাৎপর্য: এই 'Yes' বা 'হ্যাঁ' বলাটি আসলে জীবনকে গ্রহণ করার প্রতীক। হাজারো বিফলতা, ক্লান্তি আর কলুষতার মাঝেও শেষ পর্যন্ত মলি (এবং জয়েস) জীবনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। এটি যেন পুরো উপন্যাসের যাবতীয় নৈরাজ্যের শেষে এক ধরণের আধ্যাত্মিক মুক্তি।
৪. পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সাহিত্যে এর অভিঘাত
পাশ্চাত্যে: এটি প্রকাশিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় 'অশ্লীল' বলে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এটি নারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখার সাহস জোগায়। আধুনিক নারীবাদী সমালোচকরাও মলির এই 'ভয়েস' বা কণ্ঠস্বর নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন।
প্রাচ্যে (বাংলা সাহিত্য): বাংলা সাহিত্যে এই ধরণের সরাসরি 'Internal Monologue' এর প্রভাব দেখা যায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা কমলকুমার মজুমদারের কিছু নিরীক্ষামূলক লেখায়। এছাড়া বুদ্ধদেব বসুর 'রাত ভরে বৃষ্টি'র মতো উপন্যাসে নারী-পুরুষের সম্পর্কের যে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও সরাসরি কথোপকথন আছে, তার পেছনে জয়েসের এই দুঃসাহসিকতার এক পরোক্ষ অনুপ্রেরণা ছিল।
একটি ছোট তথ্য:
জেমস জয়েসের স্ত্রী নোরা বার্নাকল (Nora Barnacle) ছিলেন এই মলি ব্লুম চরিত্রের মূল অনুপ্রেরণা। মজার ব্যাপার হলো, নোরা নিজে কখনও জয়েসের এই বিখ্যাত উপন্যাসটি পুরোটা পড়েননি!
জেমস জয়েসের 'ডাবলিনার্স' (Dubliners) গল্পসংগ্রহটি আধুনিক ছোটগল্পের ইতিহাসে এক মাস্টারপিস। 'ইউলেসিস'-এর জটিলতায় যাওয়ার আগে জয়েস এই বইটিতে ডাবলিন শহরের সাধারণ মানুষের জীবনের স্থবিরতা, ব্যর্থতা এবং হঠাৎ পাওয়া আত্মোপলব্ধির কাহিনী বুনেছেন।
আপনার উল্লেখ করা গল্প দুটি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. 'অ্যারাবি' (Araby): শৈশবের মোহভঙ্গ
এটি একটি কিশোরের প্রথম প্রেমের এবং একই সাথে নিদারুণ মোহভঙ্গের গল্প।
বিষয়বস্তু: একটি কিশোর তার বন্ধুর বোনকে পছন্দ করে। সে মেয়েটিকে কথা দেয় যে 'অ্যারাবি' নামক এক মেলা থেকে তার জন্য উপহার নিয়ে আসবে। কিন্তু মেলায় পৌঁছাতে তার দেরি হয়ে যায় এবং সেখানে গিয়ে সে দেখে মেলা প্রায় শেষ, চারপাশ অন্ধকার এবং দোকানদারদের ব্যবহার অত্যন্ত যান্ত্রিক।
উপলব্ধি (Epiphany): গল্পের শেষে কিশোরটি বুঝতে পারে যে তার প্রেম এবং এই মেলা—সবই ছিল তার কল্পনাপ্রসূত অবাস্তব মোহ। ডাবলিন শহরের অন্ধকার আর দারিদ্র্যের মাঝে তার এই ক্ষুদ্র রোমান্টিক স্বপ্নটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
২. 'দ্য ডেড' (The Dead): জীবনের চেয়ে শক্তিশালী মৃত্যু
এটি জয়েসের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসেবে বিবেচিত। এটি মূলত এক দম্পতি—গ্যাব্রিয়েল এবং গ্রেটার কাহিনী।
গল্পের পটভূমি: একটি বার্ষিক ভোজসভার শেষে গ্যাব্রিয়েল তার স্ত্রী গ্রেটার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করে। কিন্তু সে আবিষ্কার করে গ্রেটা একটি পুরনো গান শুনে তার অতীত প্রেমিক মাইকেল ফিউরির কথা ভেবে কাঁদছে, যে ছেলেটি গ্রেটার জন্য খুব অল্প বয়সে প্রাণ দিয়েছিল।
বিখ্যাত সমাপ্তি: গ্যাব্রিয়েল বুঝতে পারে সে সারাজীবন গ্রেটার সাথে থাকলেও গ্রেটার মনের একটি বিশেষ অংশ জুড়ে রয়েছে সেই মৃত কিশোরটি। সে জানালার বাইরে তুষারপাত দেখতে দেখতে অনুভব করে যে, আমরা যারা বেঁচে আছি তারা আসলে যারা মারা গেছে তাদের স্মৃতির কাছে কতটা অসহায়।
দর্শন: এই গল্পে তুষারপাত (Snow) একটি বিশাল প্রতীক। এটি জীবিত এবং মৃত—উভয়কেই সমানভাবে ঢেকে ফেলে, যা জীবনের নশ্বরতাকে তুলে ধরে।
৩. জয়েসের গল্পের মূল বৈশিষ্ট্য: এপিফ্যানি (Epiphany)
জয়েসের ছোটগল্পের প্রাণ হলো 'এপিফ্যানি'। এটি এমন একটি মুহূর্ত যখন চরিত্রের সামনে জীবনের কোনো একটি গভীর সত্য হঠাৎ করে উদ্ভাসিত হয়।
'অ্যারাবি'-তে এটি হলো কিশোরের মোহভঙ্গ।
'দ্য ডেড'-এ এটি হলো গ্যাব্রিয়েলের নিজের অহংকার চূর্ণ হওয়া।
৪. বাংলা সাহিত্যে প্রভাব
জয়েসের এই 'এপিফ্যানি' বা হঠাৎ উপলব্ধির কৌশল বাংলা ছোটগল্পে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
নরেন্দ্রনাথ মিত্র বা সন্তোষকুমার ঘোষের অনেক গল্পে আমরা দেখি খুব সাধারণ একটি ঘটনার মাধ্যমে চরিত্রের ভেতর এক বিশাল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, যা জয়েসের ঘরানার কথা মনে করিয়ে দেয়।
জীবনানন্দ দাশের গল্পে যে বিষণ্ণতা এবং ডাবলিনার্স-এর মতো এক ধরণের স্থবির নাগরিক জীবনের চিত্র পাওয়া যায়, তাও জয়েসের প্রভাবের সমান্তরাল।
একটি ছোট তুলনা:
'ইউলেসিস' যদি হয় একটি বিশাল সমুদ্র, তবে 'ডাবলিনার্স' হলো একটি স্বচ্ছ আয়না—যেখানে আপনি ডাবলিনের সাধারণ মানুষের হাহাকার স্পষ্ট দেখতে পাবেন।
জেমস জয়েসের 'এপিফ্যানি' (Epiphany) ধারণাটি আধুনিক সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি কেবল একটি সাহিত্যিক কৌশল নয়, বরং জয়েসের জীবনের এক গভীর দর্শন।
নিচে এই ধারণাটি এবং আধুনিক সাহিত্যে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. 'এপিফ্যানি' আসলে কী?
'এপিফ্যানি' শব্দটি মূলত একটি ধর্মীয় শব্দ, যা যিশু খ্রিস্টের দিব্যদর্শন বা প্রকাশের সাথে যুক্ত। কিন্তু জয়েস একে সাহিত্যের আঙিনায় নিয়ে এসে একটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দেন।
সংজ্ঞা: জয়েসের মতে, এটি হলো জীবনের কোনো এক সাধারণ মুহূর্ত বা কোনো একটি তুচ্ছ বস্তু, শব্দ বা ঘটনার মাধ্যমে হঠাৎ করে কোনো মহত্তর সত্যের উদ্ভাসন।
বৈশিষ্ট্য: এটি কোনো নাটকীয় ঘটনা নয়। হয়তো রাস্তায় পড়ে থাকা কোনো সাধারণ পাথর, কারো একটি অতি সাধারণ কথা, বা কোনো একটি বিশেষ গন্ধ—হঠাৎ করে চরিত্রের মনে এক বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ তোলে। সেই মুহূর্তে চরিত্রটি নিজেকে বা জগতকে একদম নতুনভাবে চিনতে পারে।
২. জয়েসের গল্পে এপিফ্যানির উদাহরণ
'The Dead' (দ্য ডেড): গ্যাব্রিয়েল নিজেকে খুব বুদ্ধিমান এবং সফল ভাবতেন। কিন্তু গল্পের শেষে যখন তিনি জানলেন তাঁর স্ত্রী গ্রেটা আজও এক মৃত প্রেমিকের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন তাঁর সেই দীর্ঘদিনের দম্ভ ভেঙে গেল। তুষারপাতের দিকে তাকিয়ে তিনি অনুভব করলেন যে, মহাকালের কাছে জীবন ও মৃত্যু কতটা একাকার। এটাই ছিল তাঁর 'এপিফ্যানি'।
'Araby' (অ্যারাবি): মেলার সেই অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে কিশোরটি যখন বুঝতে পারে তার ভালোবাসা কেবলই কল্পনা, তখন তার চোখে জল আসে। সেই অন্ধকারই তার সত্যকে চিনিয়ে দেয়।
৩. আধুনিক সাহিত্যে 'এপিফ্যানি'-র প্রভাব
জয়েসের এই ধারণাটি উপন্যাসের গতানুগতিক 'ক্লাইম্যাক্স' বা চরম মুহূর্তের ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
চরিত্রের বিবর্তন: আধুনিক লেখকরা এখন চরিত্রের বাইরের যুদ্ধের চেয়ে ভেতরের এই 'হঠাৎ উপলব্ধির' ওপর বেশি জোর দেন।
ভার্জিনিয়া উলফ ও মোমেন্টস অফ বিয়িং: উলফের 'Moments of Being' আর জয়েসের 'Epiphany' আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুজনেই মনে করতেন, পুরো জীবন নয়, বরং জীবনের ছোট ছোট কিছু মুহূর্তই আমাদের আসল পরিচয় গড়ে দেয়।
বাংলা ছোটগল্পে প্রভাব: * তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: তাঁর অনেক গল্পে (যেমন: 'জনপদবধূ') খুব তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে চরিত্রের আত্মিক রূপান্তর ঘটে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তাঁর ছোটগল্পে ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণের পাশাপাশি এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন চরিত্র তার অস্তিত্বের নগ্ন সত্যটি টের পায়, যা জয়েসের প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়।
৪. কেন এটি আধুনিক মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক জীবন প্রচণ্ড গতিশীল এবং যান্ত্রিক। এই একঘেয়েমির মাঝে মানুষ খুব কমই বড় কোনো পরিবর্তনের সুযোগ পায়। জয়েস দেখিয়েছেন যে, আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ জীবনের ছোট ছোট ঘটনার মধ্যেই আসল 'মিরাকল' বা অলৌকিক সত্য লুকিয়ে থাকে। আমাদের শুধু তা অনুভব করার মতো সংবেদনশীল মন থাকা প্রয়োজন।
জয়েসের 'এপিফ্যানি' আমাদের শেখায় যে সাহিত্য মানে কেবল বড় বড় ঘটনা নয়, বরং মনের গহীনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ভূমিকম্প।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা

0 Comments