Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
ভার্জিনিয়া উলফ-এর 'মিসেস ডালোওয়ে' (Mrs Dalloway) ১৯২৫ সালে প্রকাশিত আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের একটি অনন্য স্তম্ভ। এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' যেমন কবিতার আঙিনায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল, উলফের এই উপন্যাসটি কথাসাহিত্যের গঠন ও বিন্যাসকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
নিচে এর বিষয়বস্তু এবং সাহিত্যিক প্রভাব আলোচনা করা হলো:
১. বিষয়বস্তু: একদিনের আবর্তে এক জীবন
এই উপন্যাসের বিশেষত্ব হলো এর সময়কাল। পুরো কাহিনীটি লন্ডনের মাত্র একটি দিনের (জুন মাসের এক বুধবার) ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
ক্ল্যারিসা ডালোওয়ে ও তার পার্টি: উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি ক্ল্যারিসা ডালোওয়ে সেদিন সন্ধ্যায় একটি পার্টির আয়োজন করছেন। সকালে তিনি ফুল কিনতে বের হন এবং সেই যাত্রাপথেই তার অতীত স্মৃতি, হারানো প্রেম (পিটার ওয়ালশ) এবং জীবনের সার্থকতা নিয়ে নানা চিন্তা ভিড় করে।
সেপ্টিমাস স্মিথ: যুদ্ধের ক্ষত: উপন্যাসের সমান্তরাল একটি চরিত্র হলো সেপ্টিমাস, যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত একজন সৈনিক। সে 'শেল শক' বা মানসিক ট্রমার শিকার। ক্ল্যারিসার জীবনের চাকচিক্যের বিপরীতে সেপ্টিমাসের জীবন আধুনিক সভ্যতার অন্ধকার ও মানসিক যন্ত্রণার দিকটি তুলে ধরে।
সময়ের চেতনা (Big Ben): উপন্যাসে বিগ বেন-এর ঘণ্টার শব্দ বারবার ফিরে আসে, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সময় বয়ে যাচ্ছে এবং মৃত্যু অনিবার্য।
চেতনাস্রোত (Stream of Consciousness): উলফ এখানে কোনো গতানুগতিক বর্ণনা দেননি। বরং চরিত্রের মনের ভেতর যে চিন্তার স্রোত বয়ে চলে, তাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ক্ল্যারিসা এবং সেপ্টিমাস একে অপরের সাথে পরিচিত না হলেও, ক্ল্যারিসার পার্টির সময় সেপ্টিমাসের আত্মহত্যার খবর তাদের এক আধ্যাত্মিক সুতোয় বেঁধে দেয়।
২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
'মিসেস ডালোওয়ে' পাশ্চাত্য উপন্যাসের ধারাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে:
মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা: বাস্তববাদ (Realism) থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের অবচেতন মনের জটিলতা প্রকাশের পথ দেখিয়েছেন উলফ। জেমস জয়েসের সাথে তিনিও আধুনিক উপন্যাসের 'স্থাপত্য' বদলে দেন।
নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: একজন নারীর দৈনন্দিন তুচ্ছ কাজের আড়ালে তার অস্তিত্বের লড়াই এবং সামাজিক অবদমনের চিত্র এখানে স্পষ্ট। এটি পরবর্তীকালের নারীবাদী সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলে।
বিনির্মাণ: মাইকেল কানিংহ্যামের বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য আওয়ার্স' (The Hours) সরাসরি এই বইটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা।
৩. প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব (বিশেষত বাংলা সাহিত্য)
বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের কাছে ভার্জিনিয়া উলফ ছিলেন আধুনিকতার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
আধুনিক বাংলা উপন্যাস: বুদ্ধদেব বসু বা অমিয় চক্রবর্তীর লেখায় যে নাগরিক মনস্তত্ত্ব ও অন্তর্মুখিতা দেখা যায়, তাতে উলফের প্রভাব স্পষ্ট।
জীবনানন্দ দাশের গদ্য: জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস ও গল্পে (যেমন: 'মাল্যবান' বা 'কারুবাসনা') চরিত্রের যে দীর্ঘ আত্মগত সংলাপ এবং পরিবেশের সূক্ষ্ম বর্ণনা পাওয়া যায়, তা অনেককাংশেই উলফের 'চেতনাস্রোত' পদ্ধতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
নারীর মনোজগত: বাংলা সাহিত্যে যে সব লেখিকা নারীর ঘরের ভেতরের একাকিত্ব ও চিন্তার জগত নিয়ে কাজ করেছেন (যেমন—আশাপূর্ণা দেবী বা পরবর্তী সময়ের নবনীতা দেব সেন), তাদের শৈলীতে পরোক্ষভাবে এই আধুনিকতাবাদী ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
একটি বিশেষ তুলনা
এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' যেমন বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভঙ্গুরতাকে কবিতার ছন্দে ধরেছিল, উলফ সেই একই শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাকে উপন্যাসের ভাষায় ধরেছেন। ক্ল্যারিসা যেখানে জীবনের বাইরের রূপটি (Sanity) ধরে রাখতে চান, সেপ্টিমাস সেখানে ভেতরের বিশৃঙ্খলা (Insanity) মেনে নিয়ে আত্মাহুতি দেয়।
ভার্জিনিয়া উলফের 'চেতনাস্রোত' (Stream of Consciousness) শৈলীটি বোঝা মানে আধুনিক উপন্যাসের ডিএনএ-কে বোঝা। গতানুগতিক উপন্যাসে লেখক বাইরে থেকে চরিত্রকে বর্ণনা করেন, কিন্তু উলফ আমাদের সরাসরি চরিত্রের মস্তিষ্কের ভেতরে বসিয়ে দেন।
নিচে এই শৈলীটি কীভাবে কাজ করে তার প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. রৈখিক সময়ের ভাঙন (Non-linear Time)
সাধারণত একটি গল্পে ঘটনা ঘটে—ক-এর পর খ, তারপর গ। কিন্তু আমাদের মন এভাবে কাজ করে না। আপনি যখন সকালে চা খাচ্ছেন (বর্তমান), তখন হঠাৎ আপনার ছোটবেলার কোনো স্মৃতি (অতীত) মনে পড়ে যেতে পারে, আবার পরক্ষণেই আপনি কালকের মিটিং নিয়ে ভাবতে পারেন (ভবিষ্যৎ)।
উদাহরণ: মিসেস ডালোওয়ে-তে ক্ল্যারিসা যখন লন্ডনের রাস্তায় হাঁটছেন, তখন বিগ বেনের ঘণ্টা শুনে তিনি বর্তমানে ফিরে আসেন, কিন্তু পরক্ষণেই একটি দোকানের জানালা দেখে তিনি ত্রিশ বছর আগের 'বার্টন'-এর দিনগুলোতে ফিরে যান।
২. মুক্ত অনুষঙ্গ (Free Association)
একটি চিন্তা থেকে আরেকটি চিন্তায় যাওয়ার জন্য কোনো যৌক্তিক লিঙ্কের প্রয়োজন হয় না। কোনো একটি শব্দ, গন্ধ বা দৃশ্য হুট করে মনের ভেতরের কোনো সুপ্ত স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।
দৃশ্যকল্প: রাস্তায় একটি গাড়ি টায়ার ফাটার শব্দ করল। সাধারণ মানুষের কাছে এটা একটা শব্দ মাত্র, কিন্তু যুদ্ধফেরত সেপ্টিমাসের কাছে তা যুদ্ধের কামানের গোলাবর্ষণের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। এই Trigger বা উদ্দীপকই চেতনার স্রোতকে বদলে দেয়।
৩. বহুস্বর বা টানেলিং (Tunneling Process)
উলফ এই পদ্ধতিকে বলতেন 'টানেলিং প্রসেস'। তিনি চরিত্রের মনের গভীরে গর্ত খুঁড়তেন যতক্ষণ না তিনি অতীতের গুহায় পৌঁছাতে পারছেন।
এতে লেখক নিজে কথা বলেন না; বরং চরিত্রের অগোছালো চিন্তা, অর্ধেক বাক্য এবং অনুভূতির মাধ্যমেই কাহিনী এগোয়।
একই দৃশ্যকে বিভিন্ন চরিত্রের চোখ দিয়ে দেখা হয়। যেমন—রাস্তায় চলা একটি বিলাসবহুল গাড়িকে দেখে ক্ল্যারিসা একরকম ভাবছেন, আর সেপ্টিমাস ভাবছেন সম্পূর্ণ অন্যরকম।
৪. ভাষার কারুকাজ ও বিরামচিহ্ন
এই শৈলীতে উলফ প্রচুর সেমিকোলন (;) এবং ড্যাশ (—) ব্যবহার করেন। এটি বোঝায় যে মানুষের চিন্তা কখনো পুরোপুরি থামে না, বরং একটি চিন্তা অন্যটির গায়ে আছড়ে পড়ে। বাক্যগুলো অনেক সময় দীর্ঘ এবং কাব্যিক হয়, যা মনের অস্থিরতাকে ফুটিয়ে তোলে।
একটি ছোট তুলনা:
উলফ বিশ্বাস করতেন জীবন কোনো সাজানো "গাড়ির ল্যাম্প" (Series of gig lamps) নয়, বরং এটি একটি "আলোকিত আভা" (Luminous halo) যা আমাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘিরে রাখে। চেতনাস্রোত শৈলীর মাধ্যমে তিনি সেই আভা বা জীবনবোধকেই ধরতে চেয়েছেন।
উলফের উপন্যাসে এই 'চেতনা' বা 'মনোজগত' কীভাবে কাজ করে তা আলোচনা করা হলো:
১. অবদমিত ইচ্ছা ও স্মৃতি (Repressed Desire)
ক্ল্যারিসা ডালোওয়ের চেতনায় কেবল বর্তমানের পার্টি নয়, বরং তার তরুণী বয়সের কিছু বিশেষ মুহূর্ত বারবার ফিরে আসে।
স্যালি সেটন (Sally Seton): ক্ল্যারিসার জীবনে স্যালির প্রতি এক ধরণের গভীর আকর্ষণ ছিল। তাদের সেই তারুণ্যের দিনগুলোর স্মৃতি ক্ল্যারিসার মনে এক ধরণের শিহরণ জাগায়, যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। এই সূক্ষ্ম 'যৌন চেতনা' বা আকর্ষণ উলফ অত্যন্ত কাব্যিকভাবে তার চিন্তার স্রোতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
পিটার ওয়ালশ: পিটারের প্রতি তার ভালোবাসা এবং তাকে প্রত্যাখ্যান করার যন্ত্রণা ক্ল্যারিসার অবচেতনে সবসময় কাজ করে।
২. সেপ্টিমাস এবং যুদ্ধের ট্রমা (Trauma and Consciousness)
সেপ্টিমাস স্মিথের চেতনা পুরোপুরি ভিন্নভাবে কাজ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তার স্বাভাবিক বোধশক্তি কেড়ে নিয়েছে।
সে মৃত বন্ধু ইভান্সকে দেখতে পায়। তার চেতনা বাস্তবে নেই, বরং যুদ্ধের বিভীষিকায় বন্দি।
উলফ এখানে দেখিয়েছেন যে, একজন মানুষের চেতনা যখন বাইরের জগতের সাথে তাল মেলাতে পারে না, তখন সমাজ তাকে 'পাগল' আখ্যা দেয়।
৩. সময় ও অস্তিত্বের চেতনা (Time and Existence)
উলফ বিশ্বাস করতেন আমাদের আসল জীবন আমাদের মনের ভেতরে।
মুহূর্তের দর্শন: তিনি একে বলতেন 'Moments of Being'। অর্থাৎ দিনের হাজারো তুচ্ছ ঘটনার মাঝে হঠাৎ কোনো এক মুহূর্তে আমরা জীবনের আসল সত্যটি অনুভব করি।
ক্ল্যারিসা যখন দেখেন যে সেপ্টিমাস আত্মহত্যা করেছে, তখন তার মনে হয় সেপ্টিমাস আসলে নিজের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তার জীবনের 'মূল সত্য' বা 'চেতনা'কে রক্ষা করেছে, যা ক্ল্যারিসা তার কৃত্রিম সামাজিক জীবনে পারছেন না।
৪. ভাষার মাধ্যমে চেতনার প্রকাশ
ভার্জিনিয়া উলফ তার উপন্যাসে এমন এক ভাষা ব্যবহার করেছেন যা অনেকটা কবিতার মতো।
তিনি চরিত্রের Inner Monologue বা স্বগতোক্তির মাধ্যমে দেখান যে, মানুষের মন এক মুহূর্তের জন্য স্থির নয়।
এই শৈলীটি পাঠককে সরাসরি চরিত্রের 'ব্যক্তিগত সত্য' বা 'প্রাইভেট ট্রুথ'-এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
সংক্ষেপে:
ভার্জিনিয়া উলফের কাছে 'চেতনা' মানে হলো মানুষের মনের সেই অদৃশ্য জগত যেখানে প্রেম, যৌনতা, মৃত্যুভয় এবং স্মৃতি—সবই একত্রে মিশে থাকে। 'মিসেস ডালোওয়ে' উপন্যাসটি সেই অদৃশ্য জগতকে দৃশ্যমান করার একটি সফল প্রচেষ্টা।
আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের তিন দিকপাল—ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস এবং ডি. এইচ. লরেন্স—প্রত্যেকেই মানুষের 'চেতনা' নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রকাশের ধরণ ছিল একদম আলাদা।
নিচে তাদের 'মনশ্চেতনা' ও 'যৌন চেতনা'র তুলনামূলক পার্থক্য আলোচনা করা হলো:
১. ভার্জিনিয়া উলফ বনাম ডি. এইচ. লরেন্স: আবছা আভা বনাম আদিম শক্তি
লরেন্স এবং উলফের মধ্যে চেতনার প্রকাশভঙ্গিতে বিশাল ব্যবধান রয়েছে:
লরেন্সের 'যৌন চেতনা' (Vitalism): লরেন্স বিশ্বাস করতেন আধুনিক সভ্যতা মানুষকে তার প্রাকৃতিক ও শারীরিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তার উপন্যাসে (যেমন: লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার) যৌনতা কেবল শরীরী মিলন নয়, বরং এটি একটি আদিম শক্তি (Life Force)। তিনি অবদমিত যৌন আকাঙ্ক্ষাকে অত্যন্ত সরাসরি এবং জৈবিকভাবে বর্ণনা করেছেন। তার কাছে চেতনা হলো 'রক্তের চেতনা' (Blood Consciousness)।
উলফের 'মনশ্চেতনা' (Impressionism): উলফ লরেন্সের এই সরাসরি বর্ণনাকে কিছুটা 'অমার্জিত' মনে করতেন। উলফের কাছে যৌনতা বা আকাঙ্ক্ষা সরাসরি শরীরী নয়, বরং তা স্মৃতি, সুগন্ধ বা মুহূর্তের শিহরণে মিশে থাকে। মিসেস ডালোওয়ে-তে ক্ল্যারিসার স্যালির প্রতি আকর্ষণ একটি 'আলোকিত মুহূর্ত' (Luminous moment) হিসেবে আসে, যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কাব্যিক।
২. ভার্জিনিয়া উলফ বনাম জেমস জয়েস: মার্জিত স্রোত বনাম বিশৃঙ্খল সত্য
জয়েস এবং উলফ দুজনেই 'Stream of Consciousness' বা চেতনাস্রোত পদ্ধতির জনক, কিন্তু তাদের প্রয়োগ ভিন্ন:
জয়েসের 'ইউলেসিস' (Ulysses): জয়েস মানুষের মনের ভেতরের প্রতিটি চিন্তা—তা যত নোংরা, অগোছালো বা কদর্যই হোক না কেন—সবই হুবহু তুলে ধরতেন। একে বলা হয় 'Raw Stream of Consciousness'। মলি ব্লুমের বিখ্যাত স্বগতোক্তিতে যৌন চিন্তা এবং শারীরিক আকাঙ্ক্ষা কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই উঠে এসেছে।
উলফের 'পার্টি' চেতনা: উলফ জয়েসের এই শৈলীকে কিছুটা 'বিশ্রী' মনে করতেন। তিনি চরিত্রের চিন্তার স্রোতকে একটি সাহিত্যিক ছাঁচে ঢালতেন। তিনি দেখাতেন কীভাবে মন বাইরের জগতের (বিগ বেন বা লন্ডনের রাস্তা) সাথে তাল মিলিয়ে চলে। উলফের চেতনাস্রোত অনেক বেশি সুসংগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক।
তিন লেখকের চেতনার তুলনামূলক ছক
সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আধুনিক সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে অন্য কোনো প্রভাবের কথা বলতে চাইছিলেন। নিচে এই আলোচনাটি পূর্ণাঙ্গ করা হলো:
১. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডি. এইচ. লরেন্স: অবদমিত কামনার বিজ্ঞান
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ এবং লরেন্সের আদিম জীবনবাদের প্রভাব ছিল গভীর।
'পুতুলনাচের ইতিকথা' বা 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন মানুষের অবচেতন মনের কামনা-বাসনা কীভাবে তার যৌক্তিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। লরেন্সের মতো মানিকও বিশ্বাস করতেন যে মানুষের জৈবিক তাড়না বা 'Libido' সমাজ ও সংস্কৃতির কৃত্রিম আবরণের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
২. বুদ্ধদেব বসু ও ভার্জিনিয়া উলফ: নাগরিক মনশ্চেতনা
বুদ্ধদেব বসুর লেখায় আমরা পাই উলফের মতো মার্জিত এবং সূক্ষ্ম এক মানসিক জগৎ।
বিশেষ করে তার 'তিথিডোর' উপন্যাসে তিনি ঘটনার চেয়ে চরিত্রের মনের সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা, একাকিত্ব এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। উলফের মতো তিনিও শব্দের কারুকাজে এক ধরণের 'আলোকিত মুহূর্ত' (Moments of Being) তৈরি করতে চেয়েছেন।
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আধুনিকতাবাদ: একটি জটিল সম্পর্ক
আপনি যদি রবীন্দ্রনাথের কথা বলতে চেয়ে থাকেন, তবে আধুনিকতার এই জোয়ারে তার ভূমিকা ছিল কৌতূহল উদ্দীপক:
রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তন: প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কবিদের (এলিয়ট বা জয়েস) 'অসংলগ্নতা' বা 'কুৎসিত' বর্ণনার কিছুটা সমালোচনা করলেও, নিজের শেষ পর্যায়ের লেখায় তিনি আধুনিকতাকে স্পর্শ করেছিলেন।
'শেষের কবিতা' ও 'ল্যাবরেটরি': এই রচনাগুলোতে রবীন্দ্রনাথ চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং নারী-পুরুষের সম্পর্কের যে আধুনিক বয়ান তৈরি করেছেন, তাতে পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদের এক ধরণের ছাঁকনি-করা প্রভাব দেখা যায়।
এলিয়টের প্রভাব: রবীন্দ্রনাথ নিজে টি.এস. এলিয়টের 'The Journey of the Magi' কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন ('তীর্থমহিমা' নামে), যা প্রমাণ করে যে তিনি এলিয়টের কাব্যভাষার পরিবর্তনের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন।
৪. জীবনানন্দ দাশ ও টি.এস. এলিয়ট: আধুনিকতার ক্লান্তি
বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্য প্রভাবের কথা বললে জীবনানন্দ দাশের নাম আসবেই।
এলিয়টের 'The Waste Land'-এর সেই আধ্যাত্মিক শূন্যতা এবং নাগরিক ক্লান্তি জীবনানন্দের 'ধুসর পাণ্ডুলিপি' বা 'বেলা অবেলা কালবেলা'-র পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। তবে জীবনানন্দ এলিয়টের মতো কেবল ঐতিহ্যের আশ্রয় নেননি, বরং বাংলার প্রকৃতি ও নিজস্ব মিথলজি ব্যবহার করে এক নতুন 'Waste Land' বা বিফলতার জগৎ তৈরি করেছিলেন।
উপসংহার
পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদ বাংলা সাহিত্যকে কেবল অনুকরণ করতে শেখায়নি, বরং মানুষের মনের অতল অন্ধকারের (মানিক), নাগরিক নিঃসঙ্গতার (বুদ্ধদেব) এবং সভ্যতার সংকটের (জীবনানন্দ) ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা

0 Comments