পবিত্র কুরআন মাজীদের গঠনশৈলী

 


পবিত্র কুরআন মাজীদের গঠনশৈলী

পবিত্র কুরআন মাজীদের গঠনশৈলী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং অলৌকিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এটি কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং এর বিন্যাস পদ্ধতিও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর নিচে কুরআনের গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

. মৌলিক বিভাজন: সূরা আয়াত

কুরআন মূলত সূরা এবং আয়াতের সমন্বয়ে গঠিত

·         সূরা: কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। প্রতিটি সূরার একটি নির্দিষ্ট নাম রয়েছে (যেমন- সূরা আল-ফাতিহা, সূরা আল-বাকারা) সবচেয়ে বড় সূরা হলো আল-বাকারা (২৮৬ আয়াত) এবং সবচেয়ে ছোট সূরা হলো আল-কাওসার ( আয়াত)

·         আয়াত: কুরআনের প্রতিটি বাক্য বা বাক্যখণ্ডকে আয়াত বলা হয়। কুরআনে মোট আয়াতের সংখ্যা নিয়ে সামান্য ভিন্নমত থাকলেও বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী এটি ,২৩৬টি

. অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল: মাক্কী মাদানী

নাজিল হওয়ার সময় এবং স্থান অনুযায়ী সূরাগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

·         মাক্কী সূরা: হিজরতের পূর্বে মক্কায় নাজিল হওয়া সূরাগুলো মাক্কী সূরা। এগুলো সংখ্যায় ৮৬টি এই সূরাগুলো সাধারণত ছোট এবং এতে তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত এবং নৈতিকতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে

·         মাদানী সূরা: হিজরতের পর মদীনায় নাজিল হওয়া সূরাগুলো মাদানী সূরা। এগুলো সংখ্যায় ২৮টি এই সূরাগুলো সাধারণত দীর্ঘ এবং এতে ইবাদত, আইন-কানুন, সমাজব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় বিধান আলোচনা করা হয়েছে

. পাঠের সুবিধার্থে প্রশাসনিক বিভাজন

তিলওয়াত বা পড়ার সুবিধার্থে কুরআনকে আরও কিছু অংশে ভাগ করা হয়েছে:

·         পারা (জুয): কুরআনকে সমান ৩০টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যাকে 'পারা' বলা হয়। এটি মূলত রমজানে বা নির্দিষ্ট সময়ে খতম করার সুবিধার্থে করা হয়েছে

·         রুকু: প্রতিটি সূরার নির্দিষ্ট কিছু আয়াত নিয়ে একটি রুকু গঠিত হয়। সাধারণত নামাজের এক রাকাতে পড়ার মতো অংশকে এক রুকু ধরা হয়। কুরআনে মোট ৫৫৬টি রুকু রয়েছে

·         মঞ্জিল: সাত দিনে পুরো কুরআন পড়ে শেষ করার সুবিধার্থে একে ৭টি মঞ্জিলে ভাগ করা হয়েছে

. বিষয়ভিত্তিক গঠন (সপ্তক পদ্ধতি)

প্রাচীন অনেক পণ্ডিত কুরআনকে সাতটি দীর্ঘ অংশে ভাগ করেছেন, যা 'তিওয়াল' (দীর্ঘ), 'মিউন' (শত আয়াতের সূরা), 'মাসানি' (বারবার পঠিত) এবং 'মুফাসসাল' (ছোট সূরা) হিসেবে পরিচিত

. গদ্য ছন্দের অলৌকিকত্ব

কুরআনের গঠনশৈলী সাধারণ গদ্যের মতো নয়, আবার এটি কবিতাও নয়। একে বলা হয় 'সাজ' (Saj') বা ছন্দময় গদ্য। এর শব্দচয়ন এবং ধ্বনিমাধুর্য আরবীয় সাহিত্যিকদের কাছে বরাবরই একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে


সূরার অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল, প্রেক্ষাপট এবং এর বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারি যেমন:

·         সূরা আল-ফাতিহা: একে কেন 'উম্মুল কুরআন' বলা হয়?

·         সূরা আল-বাকারা: এর দীর্ঘতম আয়াত (আয়াতুল কুরসী) বা এর অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট

·         সূরা আল-কাহাফ: আসহাবে কাহাফের সেই অলৌকিক ঘটনার বিবরণ

·         সূরা আল-ফীল: আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস

সূরা আল-আলাক: এক ঐতিহাসিক বিপ্লব

এই সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত হেরা গুহায় নাজিল হয়েছিল, যা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত


. শানে নুযূল (প্রেক্ষাপট)

নবী মুহাম্মদ (সা.) মক্কার পঙ্কিলতা আর জাহেলিয়াত দেখে ব্যথিত হতেন এবং হেরা গুহায় গিয়ে দীর্ঘ সময় আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। ৪০ বছর বয়সে রমজান মাসের এক নিঝুম রাতে ফেরেশতা জিবরাঈল (.) আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন

জিবরাঈল (.) এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "ইকরা" (পড়ুন) রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়তে জানি না।" এভাবে তিনবার জড়িয়ে ধরার পর জিবরাঈল (.) সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত তিলওয়াত করেন:

"পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।"

. এই সূরার বিশেষ গুরুত্ব

·         জ্ঞানের প্রাধান্য: কুরআনের প্রথম শব্দই ছিল 'ইকরা' বা 'পড়' এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্ব কতখানি

·         শিক্ষার উপকরণ: আয়াতে 'কলম'-এর উল্লেখ করা হয়েছে। সেই যুগে কলম বা লিপির ব্যবহার সীমিত থাকলেও আল্লাহ জ্ঞানের প্রসারে কলমকে মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন

·         অহংকার চূর্ণ করা: সূরার পরবর্তী অংশে (-১৮ আয়াত) আবু জাহেলের মতো দাম্ভিক ব্যক্তিদের অহংকারের নিন্দা করা হয়েছে এবং মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে সে অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক 'রক্তপিণ্ড' থেকে সৃষ্টি

. গঠনের বৈশিষ্ট্য

এই সূরাটি ছোট ছোট বাক্যে গঠিত এবং এর প্রতিটি আয়াতের শেষে একটি বিশেষ ছন্দময় ঝংকার রয়েছে। এটি পাঠ করলে অন্তরে এক ধরণের গাম্ভীর্য এবং আল্লাহর প্রতি বিনয় সৃষ্টি হয়। শেষে একটি সিজদার আয়াত রয়েছে (আয়াত ১৯), যা পাঠ করার পর মহান আল্লাহর কুদরতের সামনে সিজদাবনত হওয়া ওয়াজিব

সূরা আল-আলাক (আয়াত -)

এই পাঁচটি আয়াতই হেরা গুহায় প্রথম নাজিল হয়েছিল

  • بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম) পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

. اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ (ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক) পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন

. خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ (খালাকাল ইনসানা মিন আলাক) সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে

. اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ (ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরাম) পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু

. الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ (আল্লাজি আল্লামা বিল কালাম) যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন

. عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ (আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া'লাম) শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না


সূরার অবশিষ্ট অংশ (আয়াত -১৯)

পরবর্তী সময়ে আবু জাহেলের দম্ভ রাসূল (সা.)-কে নামাজে বাধা দেওয়ার প্রেক্ষিতে এই আয়াতগুলো নাজিল হয়

. كَلَّا إِنَّ الْإِنسَانَ لَيَطْغَى বস্তুত মানুষ তো সীমালঙ্ঘন করে

. أَن رَّآهُ اسْتَغْنَى যেহেতু সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে

. إِنَّ إِلَى رَبِّكَ الرُّجْعَى নিশ্চয় আপনার পালনকর্তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে

. أَرَأَيْتَ الَّذِي يَنْهَى আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে নিষেধ করে

১০. عَبْدًا إِذَا صَلَّى একজন বান্দাকে, যখন সে নামাজ পড়ে?

১১. أَرَأَيْتَ إِن كَانَ عَلَى الْهُدَى আপনি কি মনে করেন, যদি সে (নামাজ আদায়কারী) হেদায়েতের ওপর থাকে,

১২. أَوْ أَمَرَ بِالتَّقْوَى অথবা খোদাভীতির উপদেশ দেয়?

১৩. أَرَأَيْتَ إِن كَذَّبَ وَتَوَلَّى আপনি কি মনে করেন, যদি সে (নিষেধকারী) সত্যকে অস্বীকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়?

১৪. أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى সে কি জানে না যে, আল্লাহ (সবই) দেখছেন?

১৫. كَلَّا لَئِن لَّمْ يَنتَهِ لَنَسْفَعًا بِالنَّاصِيَةِ কখনো নয়, সে যদি বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে হেঁচড়াব

১৬. نَاصِيَةٍ كَاذِبَةٍ خَاطِئَةٍ মিথ্যাবাদী, পাপিষ্ঠের ঝুঁটি

১৭. فَلْيَدْعُ نَادِيَه অতএব সে তার সভাসদদের ডাকুক

১৮. سَنَدْعُ الزَّبَانِيَةَ আমিও ডাকব আজাবের ফেরেশতাদের

১৯. كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِب ۩ কখনো নয়! আপনি তার আনুগত্য করবেন না। আপনি সিজদা করুন এবং (আপনার রবের) নিকটবর্তী হোন। (সিজদাহ্)

সূরা আল-আলাকের শেষাংশ (-১৯ আয়াত) পাঠ করলে বোঝা যায় যে, ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে কতটা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়েছিল বিশেষ করে আবু জাহেলের ঔদ্ধত্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কঠোর হুঁশিয়ারি এই অংশটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে

ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

. আবু জাহেলের দম্ভ আস্ফালন

রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কায় কাবা চত্বরে নামাজ পড়া শুরু করেন, তখন কুরাইশ নেতা আবু জাহেল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। সে ঘোষণা করেছিল, "আমি যদি মুহাম্মদকে কাবায় সিজদা করতে দেখি, তবে তার ঘাড়ে পা দিয়ে তাকে পিষ্ট করব।" (নাউযুবিল্লাহ) সে মনে করত তার অনেক ক্ষমতা এবং সমর্থক আছে

. নামাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা

একদিন রাসূল (সা.) নামাজ পড়ছিলেন, তখন আবু জাহেল তার প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য এগিয়ে আসে। কিন্তু কাছে গিয়েই সে হঠাৎ ভয়ে পিছিয়ে আসে এবং নিজের হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করে। তার সঙ্গীরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হলো আবু জাহেল? তুমি ফিরে এলে কেন?"

আবু জাহেল উত্তর দিয়েছিল, "আমি আমার এবং মুহাম্মদের মাঝখানে আগুনের একটি পরিখা এবং অত্যন্ত ভয়াবহ কিছু ডানাওয়ালা দৃশ্য দেখতে পেয়েছি।"

রাসূল (সা.) পরে বলেছিলেন, সে যদি আর এক কদম এগিয়ে আসত, তবে ফেরেশতারা তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ছিঁড়ে নিয়ে যেত

. আল্লাহর কঠোর হুঁশিয়ারি (আয়াত ১৫-১৮)

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলো নাজিল করেন:

  • "কখনো নয়, সে যদি বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাকে চুলের ঝুঁটি ধরে হেঁচড়াব।"এখানে আবু জাহেলের অহংকারের জায়গা অর্থাৎ তার মস্তক বা ঝুঁটি ধরে টেনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে
  • "সে তার সভাসদদের (সাহায্যকারীদের) ডাকুক, আমিও ডাকব আজাবের ফেরেশতাদের (যাবানিয়াহ)"এটি ছিল আবু জাহেলের ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে এক চরম চ্যালেঞ্জ

. মুমিনের জন্য সান্ত্বনা (আয়াত ১৯)

সূরার একেবারে শেষ আয়াতে আল্লাহ তাঁর নবীকে (এবং সমস্ত মুমিনকে) অভয় দিয়ে বলেন:

"কখনো নয়! আপনি তার আনুগত্য করবেন না। আপনি সিজদা করুন এবং (আপনার রবের) নিকটবর্তী হোন।"

অর্থাৎ শত্রুর বাধা বা ভয়ভীতিতে ইবাদত ত্যাগ করা যাবে না, বরং সিজদার মাধ্যমেই আল্লাহর সবচেয়ে বেশি কাছে যাওয়া যায়


এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে বাধা আসবেই, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে বিজয় সুনিশ্চিত

·         সূরা আল-বাকারা: এর দীর্ঘতম আয়াত (আয়াতুল কুরসী) বা এর অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট

সূরা আল-বাকারার অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট (শান--নুজুল)

সূরা আল-বাকারা একবারে অবতীর্ণ হয়নি; বরং দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মদিনায় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এর আয়াতগুলো নাজিল হয়েছে

·         ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি: হিজরতের পর মদিনায় যখন একটি নতুন ইসলামী সমাজ রাষ্ট্র গঠিত হচ্ছিল, তখন ইবাদত, সামাজিক বিচারব্যবস্থা এবং পারিবারিক আইনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সূরাতেই সুদের বিধান, রোজা, হজ উত্তরাধিকার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলি দেওয়া হয়েছে

·         বনী ইসরাঈল গরু জবাইয়ের ঘটনা: এই সূরার নামকরণ করা হয়েছেবাকারাবা গাভী নামে। এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। মুসা (.)-এর যুগে বনী ইসরাঈলের মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যার অপরাধীকে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। আল্লাহ তাআলা তাদের একটি গাভী জবাই করার নির্দেশ দেন। এই আদেশের প্রতি তাদের অনর্থক প্রশ্ন অনীহা তাদের চারিত্রিক দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে

·         আহলে কিতাবদের সম্বোধন: মদিনায় বসবাসরত ইহুদি খ্রিস্টানদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের ধরন এবং তাদের পূর্ববর্তী কিতাব বিকৃত করার বিষয়েও এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে


আয়াতুল কুরসী: কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত

আপনি দীর্ঘতম আয়াতের প্রসঙ্গে 'আয়াতুল কুরসী' কথা উল্লেখ করেছেন। একটি ছোট সংশোধন হলোআয়াতুল কুরসী (আয়াত ২৫৫) হলো কুরআনের মর্যাদাবান শ্রেষ্ঠ আয়াত, তবে এটি দীর্ঘতম আয়াত নয়। কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত হলো একই সূরার ২৮২ নম্বর আয়াত (আয়াতুদ দাইন), যা ঋণ লেনদেনের নিয়মাবলি নিয়ে অবতীর্ণ

আয়াতুল কুরসীর গুরুত্ব মাহাত্ম্য

আয়াতুল কুরসীকে আল্লাহর একত্ববাদ ক্ষমতার এক অনন্য ঘোষণা বলা হয়। এতে আল্লাহর ১০টি বিশেষ গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে:

. আল্লাহর চিরঞ্জীব সত্তা: তিনি 'আল হাইয়্যুল কাইয়্যুম' (চিরঞ্জীব মহাবিশ্বের ধারক) . তন্দ্রা নিদ্রাহীনতা: সৃষ্টিজগত ক্লান্ত হলেও মহান আল্লাহ তন্দ্রা বা নিদ্রা থেকে মুক্ত। . সার্বভৌমত্ব: আকাশ জমিনে যা কিছু আছে সবকিছুর মালিক কেবল তিনি। . শাফায়াত বা সুপারিশ: তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কারো জন্য সুপারিশ করতে পারবে না। . অসীম জ্ঞান: সৃষ্টিজীবের অতীত ভবিষ্যৎ সব কিছুই তাঁর নখদর্পণে


সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬)

এই সূরার শেষ দুটি আয়াতেরও বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে।" এতে ঈমানের মূল স্তম্ভ এবং মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা না চাপানোর বিষয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া শেখানো হয়েছে

সূরা আল-বাকারা (- আয়াত)


. الم

  • উচ্চারণ: আলিফ-লাম-মীম
  • অর্থ: আলিফ, লাম, মীম (এসব হরফের প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন)

. ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

  • উচ্চারণ: যালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফীহি হুদাল্লিল মুত্তাকীন
  • অর্থ: এটি সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি পথপ্রদর্শক পরহেজগারদের (মুত্তাকীদের) জন্য

. الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

  • উচ্চারণ: আল্লাযীনা ইউ'মিনূনা বিল গাইবি ওয়া ইয়ুক্বীমু নাস সালাতা ওয়া মিম্মা রাযাক্বনাহুম ইউন্ফিক্বুন
  • অর্থ: যারা অদৃশ্যের (গায়েবের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে

. وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

  • উচ্চারণ: ওয়াল্লাযীনা ইউ'মিনূনা বিমা উনযিলা ইলাইকা ওয়ামা উনযিলা মিন ক্বাব্লিকা ওয়াবিল আখিরাতি হুম ইউক্বিনুন
  • অর্থ: এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে আপনার প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছিল তার ওপর; আর আখেরাতের প্রতি তারা নিশ্চিত বিশ্বাসী

. أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

  • উচ্চারণ: উলাইকা আলা হুদাম মির রাব্বিহিম ওয়া উলাইকা হুমুল মুফ্লিহুন
  • অর্থ: তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়েতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম

আয়াতুল কুরসী (আয়াত ২৫৫)

এটি সূরা আল-বাকারার অন্যতম শক্তিশালী ফজিলতপূর্ণ আয়াত

اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ

  • বাংলা অর্থ: "আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমান জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই। কে সেই ব্যক্তি যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানের সামান্য অংশও তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছে করেন তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমান জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সুউচ্চ, সুমহান।"

আপনি কি জানেন?

সূরা আল-বাকারার শেষ আয়াতটি (২৮৬) দোয়া হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যেখানে বলা হয়েছে:

"হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না..."

সূরা আল-বাকারা যেহেতু একটি বিশাল এবং জ্ঞানগর্ভ সূরা, তাই এর মধ্যে এমন অনেক ঘটনা বিধান রয়েছে যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আপনি চাইলে নিচে দেওয়া বিষয়গুলোর যেকোনোটি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারেন:

. বনী ইসরাঈল গাভী জবাইয়ের বিস্তারিত ঘটনা

এই সূরার নামকরণ কেন 'বাকারা' বা গাভী হলো, সেই অলৌকিক ঘটনাটি বেশ চমৎকার। মুসা (.)-এর সময়ে একজন ধনী ব্যক্তির খুনিকে খুঁজে বের করার জন্য কীভাবে একটি গাভী জবাই করা হয়েছিল এবং মৃত ব্যক্তি কীভাবে জীবিত হয়ে খুনিকে শনাক্ত করেছিল, তা বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে

. সুদের (রিবা) ভয়াবহতা বিধান

এই সূরার শেষ দিকে (আয়াত ২৭৫-২৮১) সুদ সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতিতে সুদের নিষিদ্ধতা এবং ব্যবসার বৈধতা নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে খুবই প্রাসঙ্গিক

. রোজা হজের নিয়মাবলি

রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার ঘোষণা (আয়াত ১৮৩-১৮৫) এবং হজের বিভিন্ন নিয়ম এই সূরাতেই স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আপনি যদি এর আধ্যাত্মিক বা প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে জানতে চান, তবে আমি সাহায্য করতে পারি

. তিলওয়াতের ফজিলত

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না; নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা আল-বাকারা পাঠ করা হয়।" (সহিহ মুসলিম) এই সূরার নিয়মিত পাঠের বরকত নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি

. কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা

বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা শরীফের দিকে কিবলা পরিবর্তনের যে ঐতিহাসিক ঘটনা (আয়াত ১৪২-১৪৪), তা মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বড় মাইলফলক

آيَةُ الْكُرْسِيِّ (আয়াতুল কুরসী)

اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ


বাংলা অর্থ:

"আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তন্দ্রা নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না। আসমান জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানের সামান্য অংশও তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু ইচ্ছে করেন তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমান জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সুউচ্চ, সুমহান"


এই আয়াতের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য:

  • তাওহীদের সারসংক্ষেপ: এই একটি আয়াতেই আল্লাহর ১০টি মহান গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে, যা তাঁর অসীম ক্ষমতা সার্বভৌমত্বকে প্রকাশ করে
  • নিরাপত্তার রক্ষাকবচ: হাদিসে এসেছে, রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী পাঠ করলে আল্লাহ একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যিনি সারা রাত পাঠকারীকে শয়তান অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন
  • জান্নাতের সোপান: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।" (নাসায়ী)

·         সূরা আল-কাহাফ: আসহাবে কাহাফের সেই অলৌকিক ঘটনার বিবরণ

সূরা আল-কাহাফ পবিত্র কুরআনের ১৮তম সূরা, যেখানে মহান আল্লাহআসহাবে কাহাফবাগুহাবাসীএকদল যুবকের এক বিস্ময়কর ঈমানি পরীক্ষার কথা বর্ণনা করেছেন এই অলৌকিক ঘটনাটি যুগে যুগে বিশ্বাসীদের জন্য ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর অটল আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে

নিচে আসহাবে কাহাফের সেই রোমাঞ্চকর ঘটনার মূল অংশগুলো তুলে ধরা হলো:

. সত্যের সন্ধানে ত্যাগ

ঘটনাটি এক প্রতাপশালী মূর্তিপূজক রাজার (ধারণা করা হয় রাজা দাকিয়ানুস) সমসাময়িক। একদল সম্ভ্রান্ত যুবক বুঝতে পারেন যে তাদের সমাজ শিরক বা মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত। তারা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন এবং নিজেদের ধর্মকে রক্ষা করার জন্য রাজকীয় বিলাসিতা ত্যাগ করে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন

. গুহায় আশ্রয় দীর্ঘ ঘুম

রাজার কোপানল থেকে বাঁচতে তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন:

"হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করার ব্যবস্থা করুন।" (সূরা কাহাফ: ১০)

আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদের ওপর এক দীর্ঘ গভীর তন্দ্রা চাপিয়ে দেন। তারা সেই গুহায় দীর্ঘ ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে থাকেন

. অলৌকিক রক্ষণাবেক্ষণ

সূরা কাহাফে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি তাদের দেহকে দীর্ঘ সময় অক্ষত রেখেছিলেন:

·         সূর্যের আলো: সূর্য উদয় অন্তের সময় তাদের গুহা থেকে সামান্য পাশে সরে থাকত, যাতে রোদের তাপে তাদের শরীরের ক্ষতি না হয়

·         পাশ পরিবর্তন: আল্লাহ কুদরতিভাবে তাদের ডানে এবং বামে পাশ পরিবর্তন করাতেন, যাতে মাটির কারণে তাদের চামড়া মাংস নষ্ট না হয়ে যায়

·         দৃষ্টিভঙ্গি: তাদের এই অলৌকিক অবস্থা এমন ভীতিপ্রদ ছিল যে, কেউ দেখলে ভয়ে পালিয়ে যেত। তাদের পাহারাদার কুকুরটিও গুহার মুখে পা প্রসারিত করে বসে ছিল

. ঘুম থেকে জাগরণ বিস্ময়

৩০০ বছরেরও বেশি সময় পর যখন তাদের ঘুম ভাঙে, তারা ভেবেছিলেন তারা মাত্র একদিন বা তার কিছু অংশ ঘুমিয়েছেন। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অনুভব করায় তারা তাদের একজনকে রূপার মুদ্রাসহ বাজারে পাঠান খাবার কিনতে। বাজারে গিয়ে সেই যুবক হতভম্ব হয়ে যান, কারণ সেখানকার মানুষের পোশাক, ভাষা এবং বিশেষ করে মুদ্রার ধরন কয়েকশ বছর পুরনো হয়ে গিয়েছিল

. ঘটনার শিক্ষা তাৎপর্য

এই অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ দুটি বড় সত্য তুলে ধরেছেন:

·         পুনরুত্থান: যারা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হওয়া নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে, তাদের জন্য এটি একটি বড় প্রমাণ

·         আল্লাহর সাহায্য: যারা সব ছেড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তাদের এমনভাবে রক্ষা করেন যা মানুষের কল্পনার বাইরে


সূরা আল-কাহাফ (-১০ আয়াত)

. আরবি: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنزَلَ عَلَىٰ عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَل لَّهُ عِوَجًا ۜ উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আনঝালা আলা আবদিহিল কিতাবা ওয়া লাম ইয়াজআল লাহু ইওয়াজা। অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি

. আরবি: قَيِّمًا لِّيُنذِرَ بَأْسًا شَدِيدًا مِّن لَّدُنْهُ وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا উচ্চারণ: কাইয়্যিমাল লি ইয়ুনযিরা বাসান শাদীদাম মিল্লাদুনহু ওয়া ইউবাশশিরাল মুমিনীনাল্লাযীনা ইয়ামালুনাস সালিহাতি আন্না লাহুম আজরান হাসানা। অর্থ: একে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজের পক্ষ থেকে এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য এবং মুমিনদের সুসংবাদ দেওয়ার জন্যযারা সৎকাজ করে যে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান

. আরবি: مَّاكِثِينَ فِيهِ أَبَدًا উচ্চারণ: মাকিছীনা ফীহি আবাদা। অর্থ: তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে

. আরবি: وَيُنذِرَ الَّذِينَ قَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا উচ্চারণ: ওয়া ইয়ুনযিরাল্লাযীনা কালুত তাখাযাল্লাহু ওয়ালাদা। অর্থ: আর তাদের সতর্ক করার জন্য যারা বলে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন

. আরবি: مَّا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ وَلَا لِآبَائِهِمْ ۚ كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ ۚ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا উচ্চারণ: মা লাহুম বিহি মিন ইলমিঁও ওয়ালা লিআবা-ইহিম; কাবুরাত কালিমাতান তাখরুজু মিন আফওয়াহিহিম, ইঁই ইয়াকুলুনা ইল্লা কাযিবা। অর্থ: বিষয়ে না তাদের কোনো জ্ঞান আছে, আর না তাদের পিতৃপুরুষদের। তাদের মুখ থেকে বের হওয়া শব্দটি কতই না জঘন্য! তারা কেবল মিথ্যাই বলে

. আরবি: فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا উচ্চারণ: ফালাআল্লাকা বাখিঊন নাফসাকা আলা আছারিহিম ইল্লাম ইউমিনু বিহা যাল হাদীছি আসাফা। অর্থ: তারা এই বাণীতে বিশ্বাস না করলে সম্ভবত তাদের পেছনে আপনি আক্ষেপে নিজের প্রাণ নাশ করবেন

. আরবি: إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا উচ্চারণ: ইন্না জাআলনা মা আলাল আরদি ঝীনাতাল লাহা লিনাবলুয়াহুম আইয়্যুহুম আহসানু আমালা। অর্থ: আমি পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে তাকে তার শোভা করেছি, মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ

. আরবি: وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا উচ্চারণ: ওয়া ইন্না লাজা-ইলুনা মা আলাইহা সায়ীদান জুরুঝা। অর্থ: আর ওর ওপর যা কিছু আছে, আমি অবশ্যই তাকে উদ্ভিদহীন ধূসর মাটিতে পরিণত করব

. আরবি: أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا উচ্চারণ: আম হাসিবতা আন্না আসহাবাল কাহফি ওয়ার রক্বীমি কানু মিন আয়াতিনা আজাবা। অর্থ: আপনি কি মনে করেন যে, গুহা শিলালিপির অধিকারীরা আমার নিদর্শনের মধ্যে বিস্ময়কর ছিল?

১০. আরবি: إِذْ أَوَى الْفِتْيَةُ إِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوا رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا উচ্চারণ: ইয আওয়াল ফিতইয়াতু ইলাল কাহফি ফাকালু রব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রহমাতাঁও ওয়া হাইয়্যিলানা মিন আমরিনা রশাদা। অর্থ: যখন যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল এবং বলল, "হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থা করুন।"

 

·         সূরা আল-ফীল: আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংস হওয়ার ইতিহাস

সূরা আল-ফীল পবিত্র কুরআনের ১০৫তম সূরা, যাতে মহান আল্লাহ অত্যন্ত সংক্ষেপে কিন্তু অলৌকিকভাবে মক্কার কাবা শরীফ রক্ষা করার এক ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন এই ঘটনাটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের বছর (৫৭০ খ্রিস্টাব্দ) ঘটেছিল, যা ইতিহাসে 'আমুল ফীল' বা হস্তীবর্ষ নামে পরিচিত

নিচে হস্তীবাহিনীর ধ্বংসের সেই সংক্ষিপ্ত বিস্ময়কর ইতিহাস আলোচনা করা হলো:


. আবরাহার হিংসা পরিকল্পনা

ইয়েমেনের তৎকালীন খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা আল-আশরাম সানায় একটি বিশাল গির্জা (আল-কুল্লাইস) নির্মাণ করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল আরবের হাজীদের মক্কার পরিবর্তে তার গির্জায় নিয়ে আসা। কিন্তু আরবরা যখন তাতে সাড়া দেয়নি, তখন রাগের বশবর্তী হয়ে আবরাহা পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়

. মক্কা আক্রমণ বিশাল হস্তীবাহিনী

আবরাহা ৬০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হয়। তার বাহিনীর প্রধান আকর্ষণ ছিল 'মাহমুদ' নামক এক বিশাল আকৃতির হাতি। মক্কার কুরাইশরা তখন সংখ্যায় শক্তিতে অত্যন্ত দুর্বল ছিল, তাই তারা কোনো প্রতিরোধ না গড়ে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নেয়। তৎকালীন কুরাইশ নেতা আব্দুল মুত্তালিব (মহানবী সা.-এর দাদ) বলেছিলেন:

"আমি এই উটগুলোর মালিক, তাই এগুলো রক্ষা করছি। আর ওই ঘরের (কাবা) একজন মালিক আছেন, তিনিই তা রক্ষা করবেন।"

. আসমানী আজাব ক্ষুদ্র আবাবীল পাখি

আবরাহা যখন কাবা ভাঙতে উদ্যত হয়, তখন তার প্রধান হাতি 'মাহমুদ' মক্কার দিকে এক পা- এগোতে রাজি হয়নি। ঠিক সেই মুহূর্তে লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখি আসতে শুরু করে

·         পাথর নিক্ষেপ: প্রতিটি পাখির মুখে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে মোট তিনটি ক্ষুদ্র কণা (পাথর) ছিল

·         ধ্বংসযজ্ঞ: এই ক্ষুদ্র কণাগুলো যখন সৈন্যদের ওপর নিক্ষিপ্ত হলো, তখন সেগুলো বুলেটের মতো তাদের শরীর বিদীর্ণ করে দিল

. সূরার বর্ণনা অনুযায়ী ফলাফল

আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফীলের শেষ আয়াতে এই ধ্বংসের চিত্র এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:

"অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দিলেন।" (সূরা ফীল, আয়াত: )

এর অর্থ হলো, হস্তীবাহিনী পঙ্গপালের মতো বা গবাদি পশুর চিবানো ভূষির মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মাটিতে মিশে গিয়েছিল। আবরাহা নিজেও অত্যন্ত বীভৎসভাবে মৃত্যুবরণ করে


কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ?

·         এটি কাবা ঘরের পবিত্রতা আল্লাহর কুদরতের এক জীবন্ত প্রমাণ

·         ঘটনার অল্প সময় পরই নবীজি (সা.)-এর জন্ম হয়, যা একটি নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত ছিল

·         অহংকারী শক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর ক্ষুদ্র সৃষ্টির বিজয়ের এক চিরন্তন শিক্ষা

সূরা আল-ফীল (মক্কায় অবতীর্ণ)

. আরবি: اَلَمۡ تَرَ کَیۡفَ فَعَلَ رَبُّکَ بِاَصۡحٰبِ الۡفِیۡلِ ؕ

  • উচ্চারণ: আলাম তারা কাইফা ফাআলা রাব্বুকা বিআসহাবিল ফীল
  • অনুবাদ: আপনি কি দেখেননি আপনার পালনকর্তা হস্তীবাহিনীর সাথে কী রূপ ব্যবহার করেছেন?

. আরবি: اَلَمۡ یَجۡعَلۡ کَیۡدَہُمۡ فِیۡ تَضۡلِیۡلٍ ۙ

  • উচ্চারণ: আলাম ইয়াজআল কাইদাহুম ফী তাদীলীল
  • অনুবাদ: তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি?

. আরবি: وَّ اَرۡسَلَ عَلَیۡہِمۡ طَیۡرًا اَبَابِیۡلَ ۙ

  • উচ্চারণ: ওয়া আরসালাআলাইহিম তাইরান আবাবীল
  • অনুবাদ: তিনি তাদের ওপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি (আবাবীল)

. আরবি: تَرۡمِیۡہِمۡ بِحِجَارَۃٍ مِّنۡ سِجِّیۡلٍ ۪

  • উচ্চারণ: তারমীহিম বিহিজা-রাতিম মিন সিজ্জীল
  • অনুবাদ: যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল কঙ্করময় পাথর

. আরবি: فَجَعَلَہُمۡ کَعَصۡفٍ مَّاۡکُوۡلٍ ٪

  • উচ্চারণ: ফাজাআলাহুম কাআসফিম মাকূল
  • অনুবাদ: অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দিলেন

কিছু জরুরি তথ্য:

  • আয়াত সংখ্যা: ৫টি
  • রুকু সংখ্যা: ১টি
  • নামকরণ: প্রথম আয়াতের শেষ শব্দ 'আল-ফীল' (যার অর্থ হাতি) থেকে এই সূরার নাম নেওয়া হয়েছে

সূরা আল-ফীল নাযিল হওয়ার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত অলৌকিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে ইসলামি ইতিহাসে একে 'শানে নুযূল' বা নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট বলা হয়

নিচে এর মূল কারণ প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো:

. প্রেক্ষাপট: আবরাহার দম্ভ কাবা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র

ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের প্রায় ৫০ দিন আগের। ইয়েমেনের খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা লক্ষ্য করেন যে, আরবের মানুষ প্রতি বছর মক্কায় কাবা শরীফ জিয়ারত করতে যায়। তিনি হিংসাবশত সানায় একটি বিশাল জমকালো গির্জা নির্মাণ করেন এবং ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে মানুষকে মক্কার বদলে এখানে আসতে হবে

কিন্তু আরবরা তাদের পূর্বপুরুষদের পবিত্র ঘর (কাবা) ছেড়ে সেখানে যায়নি। এমনকি একজন আরব ব্যক্তি রাগের মাথায় সেই গির্জায় নোংরামি করে আসে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আবরাহা কসম করেন যে, তিনি কাবা ঘরকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন

. কুরাইশদের অসহায়ত্ব আল্লাহর ওপর ভরসা

আবরাহা প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য এবং বিশাল আকৃতির হাতি (মাহমুদ) নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন। মক্কার কুরাইশরা তখন সংখ্যায় কম এবং সামরিকভাবে দুর্বল ছিল। তারা কোনো যুদ্ধ না করে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নেয়। কুরাইশ নেতা আব্দুল মুত্তালিব তখন আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন যে, এটি তাঁর ঘর, তিনিই যেন এটি রক্ষা করেন

. অলৌকিক ধ্বংসলীলা

আবরাহা যখন মক্কায় প্রবেশ করে কাবা ভাঙতে চাইলেন, তখন তার প্রধান হাতিটি আর এগোচ্ছিল না। ঠিক সেই সময় লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবীল পাখি ধেয়ে আসে। তাদের প্রত্যেকের ঠোঁটে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে মোট তিনটি করে কঙ্কর ছিল। এই কঙ্করগুলো যখন সৈন্যদের ওপর পড়ল, তখন তারা পঙ্গপালের মতো বা ভক্ষিত ভূষির মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়

. সূরা নাযিলের উদ্দেশ্য (শানে নুযূল)

এই অলৌকিক ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পর যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন কুরাইশ কাফেররা তাঁর বিরোধিতা করছিল এবং নব্য মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করছিল

আল্লাহ তায়ালা এই সূরাটি নাযিল করেন দুটি মূল কারণে:

·         কুরাইশদের স্মরণ করিয়ে দিতে: আল্লাহ তাদের দেখিয়েছিলেন যে, তিনি কীভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের এবং পবিত্র কাবাকে আবরাহার মতো শক্তিশালী শত্রু থেকে রক্ষা করেছিলেন। সুতরাং তাদের উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং তাঁর রাসূলের (সা.) ওপর ঈমান আনা

·         রাসূল (সা.)-কে সান্ত্বনা দিতে: শত্রুরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহ তাঁর দ্বীন এবং তাঁর ঘর রক্ষা করতে সক্ষমএই বার্তা দিয়ে নবীজিকে সাহস প্রদান করা

  @আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।

 Click Icon For Follow me সাবস্ক্রাইব করুন



Click Topics and Read Thank you visit again 

Post a Comment

0 Comments