পাশা খেলা ও পাণ্ডবদের বনবাস
মহাভারতের সভাপর্ব হলো পুরো মহাকাব্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সন্ধিক্ষণ। এই পর্বেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল। নিচে পাশা খেলা ও পাণ্ডবদের বনবাসের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. প্রেক্ষাপট: ময়দানব ও ইন্দ্রপ্রস্থের ঐশ্বর্য
রাজসূয় যজ্ঞের পর পাণ্ডবদের প্রতিপত্তি এবং ময়দানব নির্মিত তাঁদের অপূর্ব 'সভাভবন' দেখে দুর্যোধন ঈর্ষায় দগ্ধ হচ্ছিলেন। সেই স্ফটিকতুল্য সভায় জলকে স্থল এবং স্থলকে জল মনে করে দুর্যোধন উপহাসের পাত্র হন। এই অপমান এবং পাণ্ডবদের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার লালসা থেকেই শকুনি ও দুর্যোধন পাশা খেলার ষড়যন্ত্র করেন।..
মহাভারতের সভাপর্বের শুরুতে ময়দানব কর্তৃক নির্মিত ইন্দ্রপ্রস্থের সেই অদ্ভুত মায়াসভা পাণ্ডবদের উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিল, আবার এটিই ছিল কৌরবদের ঈর্ষার মূল কারণ। নিচে এর ঐশ্বর্য ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো:
১. ময়দানবের কৃতজ্ঞতা ও সভা নির্মাণ
খাণ্ডব দহনকালে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ অগ্নিদেবের হাত থেকে দানব স্থপতি ময়দানবকে রক্ষা করেছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ময়দানব পাণ্ডবদের জন্য এমন এক সভাভবন তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা দেবরাজ ইন্দ্রের সভার চেয়েও শ্রেষ্ঠ হবে।
উপাদান সংগ্রহ: ময়দানব কৈলাস পর্বতের কাছে অবস্থিত বিন্দুসর নামক হ্রদ থেকে স্ফটিক, মণি-মাণিক্য এবং বিচিত্র রত্ন সংগ্রহ করে এনেছিলেন।
২. সভাভবনের অলৌকিক বৈশিষ্ট্য
ইন্দ্রপ্রস্থের এই সভাটি কেবল একটি প্রাসাদ ছিল না, এটি ছিল স্থাপত্যবিদ্যার এক চরম বিস্ময়। এর প্রধান আকর্ষণ ছিল এর বিভ্রম (Illusion):
স্থলের বদলে জল: সভার মেঝে এমন উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ স্ফটিক দিয়ে তৈরি ছিল যে, মনে হতো সেখানে গভীর জলাশয় রয়েছে। ফলে অনেকে কাপড় গুটিয়ে হাঁটতেন।
জলের বদলে স্থল: আবার অনেক জায়গায় যেখানে সত্যিকারের জলাশয় বা নীল পদ্মশোভিত পুকুর ছিল, সেখানে মেঝে এত নিখুঁত ছিল যে মনে হতো তা কঠিন সমতল ভূমি।
রত্নখচিত কারুকাজ: দেওয়ালগুলো ছিল মণি-মাণিক্য খচিত এবং সেখানে কৃত্রিম লতা-গুল্ম ও পাখির মূর্তি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যা জীবন্ত বলে ভ্রম হতো।
বিশালতা: এটি ছিল প্রায় দশ হাজার কিউবিট (হস্ত) বিস্তৃত এবং আকাশে ভাসমান মেঘের মতো শুভ্র ও বিশাল।
৩. দুর্যোধনের বিভ্রান্তি ও অপমান
রাজসূয় যজ্ঞ শেষে যখন কৌরবরা এই সভা পরিদর্শন করতে আসেন, তখন দুর্যোধন একের পর এক বিভ্রমের শিকার হন:
শুষ্ক মেঝে দেখে তিনি মনে করেন সামনে জল আছে, তাই তিনি নিজের রাজকীয় পোশাক টেনে তুলে হাঁটতে শুরু করেন।
এরপর সামনে স্বচ্ছ জল দেখে তিনি মনে করেন এটি কঠিন মেঝে, আর সেখানে পা দিতেই তিনি গভীর জলে পড়ে যান।
এই দৃশ্য দেখে দ্রৌপদী এবং পাণ্ডবরা হেসে ফেলেন। লোকগাথা অনুযায়ী দ্রৌপদী তখন মন্তব্য করেছিলেন, "অন্ধের পুত্র অন্ধই হয়" (যদিও মূল ব্যাসদেব রচিত মহাভারতে এই উক্তিটির সরাসরি উল্লেখ নেই, সেখানে কেবল উপহাসের কথা বলা হয়েছে)।
৪. রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব
ঈর্ষার জন্ম: ইন্দ্রপ্রস্থের এই অতুলনীয় সম্পদ দেখে দুর্যোধনের মনে প্রবল হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পারেন যুদ্ধ করে পাণ্ডবদের হারানো কঠিন, তাই তিনি শকুনিকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেন।
পাশা খেলার পটভূমি: ময়দানব নির্মিত এই সভার ঐশ্বর্যই মূলত ধৃতরাষ্ট্রকে 'পাশা খেলা'র অনুমতি দিতে বাধ্য করার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
ময়দানবের এই শিল্পকর্মটিকে আজও সাহিত্যের ইতিহাসে "স্থাপত্যের জাদু" বা মায়াসভা হিসেবে স্মরণ করা হয়।
২. পাশা খেলা ও শকুনি
ধৃতরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে পাণ্ডবদের হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যুধিষ্ঠির জানতেন পাশা খেলা ক্ষতিকর, কিন্তু তৎকালীন ক্ষত্রিয় ধর্ম অনুযায়ী আমন্ত্রিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। শকুনির কাছে ছিল মায়াবী পাশা, যা তাঁর নির্দেশমতো চলত।
পণ: একে একে যুধিষ্ঠির তাঁর ধনসম্পদ, রথ, ঘোড়া, রাজ্য, এমনকি নিজের ভাইদের এবং নিজেকেও পণ রেখে হেরে যান।
দ্রৌপদীর অপমান: সবশেষে যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকে পণ রাখেন এবং হেরে যান। এরপর রাজসভায় দুঃশাসন দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিত করেন। ধৃতরাষ্ট্র তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে পাণ্ডবদের সব ফিরিয়ে দিয়ে তাঁদের বিদায় দেন।
মহাভারতের সভাপর্বের সবচেয়ে কলঙ্কিত এবং নাটকীয় অধ্যায় হলো এই 'পাশা খেলা'। এর নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন গান্ধার রাজ শকুনি। নিচে এই পাশা খেলার ছক ও শকুনির ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শকুনির প্রতিহিংসা ও পরিকল্পনা
শকুনি কেবল দুর্যোধনের মামা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত একজন কূটনীতিবিদ। পাণ্ডবদের রাজসূয় যজ্ঞের ঐশ্বর্য দেখে দুর্যোধন যখন অবসাদে ভুগছিলেন, তখন শকুনি তাঁকে যুদ্ধের পরিবর্তে 'দ্যুতক্রীড়া' বা পাশা খেলার পরামর্শ দেন।
শকুনির পাশা: বলা হয়, শকুনির পাশাগুলো তাঁর মৃত পিতার হাড় দিয়ে তৈরি ছিল, যা কেবল শকুনির নির্দেশমতোই কাজ করত। এটি ছিল এক ধরনের মায়াবী পাশা।
লক্ষ্য: পাণ্ডবদের অস্ত্র দিয়ে হারানো কঠিন ছিল, তাই শকুনি তাঁদের নৈতিকতা ও 'ক্ষত্রিয় ধর্ম'-কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁদের সর্বস্বান্ত করার ছক কষেন।
২. খেলার প্রেক্ষাপট ও আমন্ত্রণ
ধৃতরাষ্ট্রকে দিয়ে পাণ্ডবদের হস্তিনাপুরে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যুধিষ্ঠির জানতেন পাশা খেলা বিনাশের কারণ, কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাজা বা ক্ষত্রিয় পাশা খেলার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন না (এটি ছিল বীরত্বের পরিপন্থী)।
প্রতিপক্ষ: খেলার আসরে দুর্যোধনের হয়ে পাশা চালেন শকুনি। যুধিষ্ঠির এতে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত খেলতে রাজি হন।
৩. যুধিষ্ঠিরের পরাজয়ের পর্যায়সমূহ
খেলা শুরু হলে শকুনি তাঁর মায়াবী চাল দিয়ে একে একে যুধিষ্ঠিরকে হারিয়ে দিতে থাকেন। যুধিষ্ঠির নেশাগ্রস্তের মতো একের পর এক পণ রাখতে শুরু করেন:
প্রথম পর্যায়: রত্ন, স্বর্ণ, রৌপ্য এবং রাজকোষ।
দ্বিতীয় পর্যায়: রথ, ঘোড়া, হাতি এবং বিশাল সেনাবাহিনী।
তৃতীয় পর্যায়: সম্পূর্ণ রাজ্য এবং প্রজাদের অধিকার।
চরম পর্যায়: যখন তাঁর আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তখন শকুনি তাঁকে প্ররোচিত করেন ভাইদের পণ রাখতে। একে একে নকুল, সহদেব, অর্জুন এবং ভীমকে তিনি হারান। শেষে নিজেকেও পণ রেখে যুধিষ্ঠির পরাজিত হয়ে কৌরবদের দাসে পরিণত হন।
৪. দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও শকুনির জয়
সব হারিয়ে ফেলার পর শকুনি যখন দেখলেন যুধিষ্ঠির নিঃস্ব, তখন তিনি শেষ চালটি চালেন—দ্রৌপদীকে পণ রাখা। যুধিষ্ঠির এই সর্বনাশা সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখানেও হেরে যান। এর ফলেই রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে।
৫. শকুনির চরিত্রের বৈশিষ্ট্য
মনস্তাত্ত্বিক চাল: শকুনি জানতেন যুধিষ্ঠিরের দুর্বলতা কোথায়। তিনি প্রতিবার চাল দেওয়ার আগে যুধিষ্ঠিরকে উত্তেজিত করতেন এবং জেতার লোভ দেখাতেন।
অখণ্ড মনোযোগ: শকুনির একমাত্র লক্ষ্য ছিল হস্তিনাপুরের সিংহাসনে দুর্যোধনকে বসানো এবং পাণ্ডবদের ধ্বংস করা। এই পাশা খেলাই ছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রথম অনানুষ্ঠানিক শুরু।
ফলাফল:
এই খেলার মাধ্যমেই পাণ্ডবরা ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হন। শকুনির এই 'মায়াবী পাশা' আসলে ছলনা ও অধর্মের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. অনুদ্যূত বা দ্বিতীয়বার পাশা খেলা
পাণ্ডবরা ফিরে যাওয়ার পর দুর্যোধন ও কর্ণ পুনরায় ধৃতরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করেন। তাঁরা জানতেন পাণ্ডবরা মুক্ত থাকলে ভবিষ্যতে প্রতিশোধ নেবেন। তাই আবার তাঁদের ডেকে আনা হয়। এবারের শর্ত ছিল একেবারেই ভিন্ন:
শর্ত: যে পক্ষ হারবে, তারা ১২ বছর বনবাস এবং ১ বছর অজ্ঞাতবাস (পরিচয় লুকিয়ে থাকা) করবে। যদি অজ্ঞাতবাসে ধরা পড়ে যায়, তবে আবার ১২ বছরের বনবাস শুরু হবে।
প্রথমবার পাশা খেলায় ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের মুক্ত করে দিলেও, কৌরবদের কূটনীতি এবং শকুনির জিঘাংসা দমে যায়নি। এর ফলেই আয়োজিত হয়েছিল 'অনুদ্যূত' বা দ্বিতীয়বারের পাশা খেলা। নিচে এর প্রেক্ষাপট ও ফলাফল তুলে ধরা হলো:
১. প্রেক্ষাপট ও দুর্যোধনের ভয়
ধৃতরাষ্ট্র যখন পাণ্ডবদের তাঁদের রাজ্য এবং সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন, তখন দুর্যোধন, কর্ণ ও শকুনি অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা জানতেন:
রাজসভায় দ্রৌপদীর যে অপমান হয়েছে, ভীম ও অর্জুন তার প্রতিশোধ অবশ্যই নেবেন।
পাণ্ডবরা মুক্ত থাকা মানেই কৌরবদের বিনাশ নিশ্চিত।
তাই তাঁরা ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝান যে, পাণ্ডবদের এখনই থামানো না গেলে কুরুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁরা প্রস্তাব দেন পাণ্ডবদের আবার ডেকে এনে এমন একটি শর্তে পাশা খেলা হোক, যাতে তাঁরা দীর্ঘ সময়ের জন্য রাজ্যহীন হয়ে পড়েন।
২. ধৃতরাষ্ট্রের সম্মতি ও আমন্ত্রণ
ধৃতরাষ্ট্র তাঁর পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে এবং বিদুরের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও পাণ্ডবদের ফিরে আসার আদেশ দেন। যুধিষ্ঠির তখন ইন্দ্রপ্রস্থের পথে কিছুটা দূর এগিয়েছিলেন। রাজআজ্ঞা ও ক্ষত্রীয় ধর্মের দোহাই দিয়ে তাঁকে আবার হস্তিনাপুরে ফিরিয়ে আনা হয়। যুধিষ্ঠির জানতেন এটি একটি ফাঁদ, তবুও 'ভাগ্য' ও 'কর্তব্যের' টানে তিনি অসম্মতি জানাতে পারেননি।
৩. খেলার অমোঘ শর্ত
দ্বিতীয়বার বা অনুদ্যূতের সময় শকুনি একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠিন শর্ত আরোপ করেন:
"যে পক্ষ এই খেলায় হারবে, তারা মৃগচর্ম পরিধান করে ১২ বছর বনবাসে যাবে এবং এরপর ১ বছর 'অজ্ঞাতবাস' (গোপন পরিচয়) পালন করবে। যদি এই অজ্ঞাতবাসের সময় তাদের চিনে ফেলা হয়, তবে আবারও ১২ বছরের বনবাস শুরু হবে।"
শকুনি জানতেন যুদ্ধের ময়দানে পাণ্ডবদের হারানো অসম্ভব, কিন্তু তেরো বছরের এই দীর্ঘ নির্বাসন তাঁদের শক্তি ও জনসমর্থন কমিয়ে দেবে।
৪. ফলাফল ও পাণ্ডবদের যাত্রা
পূর্বের মতোই শকুনির মায়াবী পাশার কাছে যুধিষ্ঠির পরাজিত হন।
বনবাসের প্রস্তুতি: শর্ত অনুযায়ী পাণ্ডবরা তাঁদের রাজকীয় অলঙ্কার ও বস্ত্র ত্যাগ করেন। তাঁরা বল্কল ও মৃগচর্ম ধারণ করেন।
শপথ: এই যাত্রার আগে ভীম উচ্চস্বরে শপথ করেন যে, তিনি দুঃশাসনের রক্ত পান করবেন এবং দুর্যোধনের উরু ভঙ্গ করবেন। অর্জুন শপথ করেন কর্ণকে বধ করার।
বিলাপ: হস্তিনাপুরের প্রজারা এই অন্যায় দেখে হাহাকার করতে থাকে, কিন্তু পাণ্ডবরা তাঁদের ধর্ম রক্ষার্থে দ্রৌপদীকে সঙ্গে নিয়ে বনের দিকে রওনা হন।
অনুদ্যূতের গুরুত্ব:
এই দ্বিতীয়বার পাশা খেলাই ছিল মহাভারতের ইতিহাসের 'টার্নিং পয়েন্ট'। এর মাধ্যমেই পাণ্ডবদের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময় 'বনপর্ব'-এর সূচনা হয়, যা তাঁদের পরবর্তী যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।
৪. পরাজয় ও বনবাসের যাত্রা
শকুনি পুনরায় কারচুপির মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেন। শর্ত অনুযায়ী, পাণ্ডবরা তাঁদের রাজকীয় পোশাক ত্যাগ করে মৃগচর্ম পরিধান করেন। কান্নায় ভেঙে পড়া প্রজাদের ছেড়ে দ্রৌপদীসহ পাঁচ ভাই বনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
অনুদ্যূত বা দ্বিতীয়বার পাশা খেলায় পরাজয়ের পর পাণ্ডবদের হস্তিনাপুর ত্যাগ ও বনবাসের যাত্রার দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত শোকাবহ এবং নাটকীয়। এটি মহাভারতের সভাপর্বের সমাপ্তি এবং বনপর্বের সূচনা।
১. পরাজয়ের পরবর্তী দৃশ্য
শকুনির ছলনায় যুধিষ্ঠির পরাজিত হওয়ার পর সভার মধ্যে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। শর্ত অনুযায়ী পাণ্ডবদের এখন তাঁদের রাজকীয় সমস্ত অধিকার ত্যাগ করতে হবে।
বস্ত্র পরিবর্তন: পাঁচ ভাই তাঁদের মহামূল্যবান রাজপোশাক ও অলঙ্কার খুলে ফেলেন এবং তার বদলে মৃগচর্ম ও বল্কল (গাছের ছাল) পরিধান করেন।
ধৃতরাষ্ট্রের মৌনতা: এই চরম অন্যায়ের সময়ও ধৃতরাষ্ট্র নির্বাক ছিলেন, যা পাণ্ডবদের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।
২. পাণ্ডবদের প্রতিজ্ঞা ও শপথ
বনবাসে যাওয়ার সময় পাণ্ডবরা কেবল শোকাতুর ছিলেন না, তাঁদের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলছিল প্রতিশোধের আগুন:
ভীম: তিনি উচ্চস্বরে শপথ করেন যে, যুদ্ধের ময়দানে তিনি দুঃশাসনের বুক চিরে রক্ত পান করবেন এবং যে উরুতে বসতে বলে দুর্যোধন দ্রৌপদীকে অপমান করেছিলেন, সেই উরু গদাঘাতে চূর্ণ করবেন।
অর্জুন: তিনি কর্ণকে লক্ষ্য করে প্রতিজ্ঞা করেন যে, যুদ্ধের সময় তাঁর শরজালে কর্ণকে বিনাশ করবেন।
সহদেব ও নকুল: তাঁরা যথাক্রমে শকুনি এবং উলুকের (শকুনির পুত্র) বিনাশের শপথ নেন।
৩. দ্রৌপদীর অবস্থা
দ্রৌপদী তাঁর খোলা চুল (যা দুঃশাসন টেনেছিলেন) না বেঁধে শপথ করেন যে, যতক্ষণ না দুঃশাসনের রক্ত দিয়ে সেই চুল ধোয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি চুল বাঁধবেন না। তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে কিন্তু দৃঢ় সংকল্প নিয়ে স্বামীদের অনুসরণ করেন।
৪. প্রজাদের হাহাকার ও বিদুর
পাণ্ডবরা যখন হস্তিনাপুর ছেড়ে বনের দিকে রওনা হন, তখন নগরের হাজার হাজার প্রজা তাঁদের পিছু নেয়। তারা কৌরবদের অভিশাপ দিতে থাকে এবং প্রিয় রাজাদের সঙ্গে বনে যেতে চায়। কিন্তু যুধিষ্ঠির তাঁদের শান্ত করে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন।
বিদুর: ধার্মিক বিদুর পাণ্ডবদের এই যাত্রায় অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি কুন্তীকে (পাণ্ডবদের মাতা) নিজের কাছে আশ্রয় দেন, কারণ বার্ধক্যের কারণে কুন্তীর পক্ষে বনে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
৫. বনবাসের গন্তব্য
পাণ্ডবরা হস্তিনাপুর থেকে বের হয়ে গঙ্গার তীর ধরে এগিয়ে যান। তাঁদের প্রথম গন্তব্য ছিল কুরুজঙ্গল এলাকার দ্বৈতবন এবং পরবর্তীতে কাম্যক বন। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের কুলপুরোহিত ধৌম্য এবং কিছু একনিষ্ঠ অনুগামী ব্রাহ্মণ।
এই যাত্রার গুরুত্ব
এই বনবাস কেবল তেরো বছরের শাস্তি ছিল না, এটি ছিল পাণ্ডবদের জন্য এক কঠিন প্রশিক্ষণ কাল। এই সময়েই:
অর্জুন মহাদেবের কাছ থেকে পাশুপত অস্ত্র লাভ করেন।
তাঁরা বিভিন্ন তীর্থ ভ্রমণ করে আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করেন।
শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়, যা পরবর্তী ধর্মযুদ্ধে জয়ের মূল ভিত্তি তৈরি করে।
এই ঘটনার গুরুত্ব:
ধর্ম বনাম অধর্ম: এই পর্বটি দেখায় কীভাবে যুধিষ্ঠিরের সত্যনিষ্ঠা বা 'ধর্ম' তাঁকে সংকটে ফেলেছে, আবার কৌরবদের 'অধর্ম' চরম সীমায় পৌঁছেছে।
প্রতিজ্ঞা: বনবাসে যাওয়ার সময় ভীম ও অর্জুন কৌরবদের বিনাশ করার কঠিন শপথ নেন, যা পরবর্তীকালে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বাস্তবায়িত হয়।

0 Comments