Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের 'In Memoriam A.H.H.' কেবল ভিক্টোরিয়ান যুগের শ্রেষ্ঠ শোকগাথা নয়, বরং এটি মানুষের বিশ্বাস, সংশয় এবং বিবর্তনের এক মহাকাব্যিক দলিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর্থার হেনরি হ্যালামের অকাল মৃত্যুতে (১৮৩৩) গভীর শোক থেকে এই কাব্যগ্রন্থের জন্ম।
১. কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু
এই দীর্ঘ কবিতায় টেনিসন তাঁর শোকের উত্তরণকে ১৭ বছর ধরে (১৮৩৩-১৮৫০) ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছেন। এর মূল পর্যায়গুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
ব্যক্তিগত শোক ও হাহাকার: শুরুর দিকে কবির মনে হয়েছে প্রকৃতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তিনি প্রকৃতির 'রক্তাক্ত দাঁত ও নখ' (Nature, red in tooth and claw) দেখে বিচলিত হয়েছেন, যেখানে ব্যক্তির কোনো মূল্য নেই।
ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব: ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনের বিবর্তনবাদের প্রাথমিক আভাস এবং ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। টেনিসন এই কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষ কি কেবলি বিবর্তনের একটি তুচ্ছ ধাপ, নাকি তার কোনো অমর আত্মা আছে?
শোক থেকে উত্তরণ: সময়ের সাথে সাথে কবি উপলব্ধি করেন যে, মৃত্যু জীবনের শেষ কথা নয়। হ্যালাম তাঁর কাছে কেবল এক মৃত বন্ধু নন, বরং এক উন্নততর মানবাত্মার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ঐশ্বরিক প্রেম ও মিলন: কবিতার শেষে কবির সংশয় দূর হয়। তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মহাবিশ্ব এক 'মহত্তর লক্ষ্য' (Far-off divine event)-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
পাশ্চাত্য সাহিত্যে এই কাব্যগ্রন্থটি এক নতুন ধারার সূচনা করে:
শোকগাথার নতুন রূপ: মিলটনের 'Lycidas' বা শেলীর 'Adonais'-এর মতো চিরাচরিত প্যাস্টোরাল এলিজি থেকে বেরিয়ে এসে টেনিসন এতে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক মাত্রা যোগ করেন।
ভিক্টোরিয়ান কণ্ঠস্বর: এটি রানী ভিক্টোরিয়ার অত্যন্ত প্রিয় ছিল। সমকালীন মানুষের হারানো ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির মাঝে ভারসাম্য আনার যে চেষ্টা, তা ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের প্রধান সুরে পরিণত হয়।
টি. এস. এলিয়ট ও আধুনিকতাবাদ: আধুনিক কবি টি. এস. এলিয়ট টেনিসনের এই কবিতার ছন্দ ও দার্শনিক গভীরতার প্রশংসা করেছেন এবং এটি পরবর্তী কবিদের সংশয়বাদী কবিতার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
৩. প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব
প্রাচ্য সাহিত্য, বিশেষ করে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে 'In Memoriam'-এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: রবীন্দ্রনাথের 'স্মরণ' কাব্যগ্রন্থটি তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে লেখা হলেও, সেখানে ব্যক্তিগত শোক থেকে বিশ্বজনীন দর্শনে উত্তরণের যে প্রক্রিয়া, তার সাথে 'In Memoriam'-এর কাঠামোগত মিল পাওয়া যায়। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের 'জীবনস্মৃতি' ও মৃত্যুসংক্রান্ত দর্শনে টেনিসনের আধ্যাত্মিক উত্তরণের ছোঁয়া লক্ষ্য করা যায়।
শোককাব্য বা এলিজি ধারা: উনিশ শতকের আধুনিক বাঙালি কবিরা যখন শোকগাথা লিখতে শুরু করেন, তখন টেনিসনের এই রচনার শৈলী (Style) তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
জীবনবাদ ও বিবর্তন: প্রাচ্যের অদ্বৈতবাদ বা আধ্যাত্মিক চিন্তার সাথে টেনিসনের 'অমর আত্মা'র ধারণার একটি মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়ায় এটি ভারতের শিক্ষিত সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
'In Memoriam' কেবল একটি মৃত্যুশোকের কবিতা নয়, এটি একটি রূপান্তরের ইতিহাস। এটি দেখায় কীভাবে ব্যক্তিগত দুঃখ থেকে যাত্রা শুরু করে মানুষ মহাজাগতিক সত্যে পৌঁছাতে পারে।
In Memoriam'-এর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী তিনটি স্তবকের (বা থিম) অর্থ নিচে তুলে ধরছি, যা পরীক্ষার উত্তর বা আলোচনার গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করবে:
১. প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা ও বিবর্তন (Stanza 56)
"Nature, red in tooth and claw / With ravine, shriek'd against his creed"
তাৎপর্য: এটি এই কাব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। টেনিসন এখানে দেখিয়েছেন যে প্রকৃতি দয়ালু নয়। বিজ্ঞান (তথা জীবাশ্মবিদ্যা) বলছে হাজার হাজার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কবি প্রশ্ন তুলছেন, যদি প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর হয়, তবে মানুষের প্রার্থনা বা প্রেমের কি কোনো মূল্য আছে? এটি আধুনিক সংশয়বাদের এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
২. হারানো প্রেমের মূল্য (Stanza 27)
"’Tis better to have loved and lost / Than never to have loved at all."
তাৎপর্য: এই পঙক্তিটি বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। কবি বলতে চেয়েছেন, প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা থাকলেও, কাউকে ভালোবাসতে পারাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। বন্ধু হ্যালামকে হারিয়ে তিনি নিঃস্ব হননি, বরং ভালোবাসার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছেন।
৩. নতুন যুগের আবাহন (Ring Out, Wild Bells - Section 106)
"Ring out the old, ring in the new... / Ring out the false, ring in the true."
তাৎপর্য: এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের গান। এখানে কবি অতীতের শোক, জীর্ণতা এবং মিথ্যাকে বিদায় জানিয়ে সত্য ও সুন্দর এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করেছেন। এই অংশটি আজও নববর্ষের আবাহন সংগীত হিসেবে পাশ্চাত্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এই কাব্যের দার্শনিক ভিত্তি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে, যা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করছি:
১. সংশয় ও বিশ্বাসের সংগ্রাম (Conflict of Doubt and Faith)
টেনিসন যখন এই কবিতা লিখছিলেন, তখন ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আধুনিক বিজ্ঞানের (বিশেষ করে ভূতত্ত্ব ও জীববিদ্যা) মধ্যে তীব্র লড়াই চলছিল।
দর্শন: টেনিসন অন্ধ বিশ্বাসে ডুবে থাকতে পারেননি, আবার বিজ্ঞানকে অস্বীকারও করতে পারেননি। তাঁর দর্শন হলো—"সংশয়হীন বিশ্বাসের চেয়ে সৎ সংশয় অনেক বেশি মূল্যবান" ("There lives more faith in honest doubt, / Believe me, than in half the creeds")।
২. বিবর্তনবাদী আধ্যাত্মবাদ (Evolutionary Spiritualism)
ডারউইনের আগেকার বিবর্তনবাদী ধারণা টেনিসনকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি মনে করতেন, মানুষের বিবর্তন কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক ও আধ্যাত্মিক।
দর্শন: হ্যালামের মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন এক প্রকার বিবর্তন হিসেবে। তাঁর মতে, মানুষ একসময় পশু ছিল, এখন সে মানুষ, আর ভবিষ্যতে সে আরও উন্নত এক অতিমানবীয় স্তরে পৌঁছাবে। হ্যালাম ছিলেন সেই 'ভবিষ্যৎ মানুষের' এক অগ্রদূত।
৩. সর্বেশ্বরবাদী ভালোবাসা (Pantheistic Love)
কবিতার শেষের দিকে কবি অনুভব করেন যে, হ্যালাম কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বা কবরে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি প্রকৃতির প্রতিটি ধূলিকণায়, নক্ষত্রে এবং বাতাসের স্পন্দনে মিশে আছেন।
দর্শন: এটি অনেকটা ভারতীয় দর্শনের 'অদ্বৈতবাদ' বা সুফিবাদের মতো। যেখানে প্রেমাস্পদ বা ঈশ্বর জগতের সবকিছুর মধ্যেই বিদ্যমান। টেনিসন ঈশ্বরকে কেবল দূরবর্তী কোনো শক্তি হিসেবে নয়, বরং এক অনন্ত ভালোবাসা হিসেবে কল্পনা করেছেন।
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস 
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০) 
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales) 
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur 
9. William Langland: Piers Plowman 
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০) 
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet 
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus 
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene 
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮) 
16. John Dryden: Absalom and Achitophel 
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock 
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস) 
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe 
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য 
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব: 
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু 
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু 
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ 
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু 
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু 
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু 
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু 
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা 
একটি বিশেষ উদ্ধৃতির গভীর ব্যাখ্যা:
"Strong Son of God, immortal Love,"
কবিতার প্রস্তাবনায় (Prologue) এই লাইনটি পাওয়া যায়। এখানে কবি যীশুকে বা ঈশ্বরকে কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে দেখছেন না, বরং তাঁকে "Immortal Love" বা অমর ভালোবাসা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কবির দর্শন হলো—আমাদের যুক্তি (Reason) যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই প্রকৃত বিশ্বাসের শুরু। পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
.jpg)
0 Comments