John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
জন কিটসের 'ওড টু আ নাইটিঙ্গেল' (Ode to a Nightingale) ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। এটি কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং জীবন, মৃত্যু, শিল্প এবং বাস্তবতার মধ্যকার সংঘাতের এক অনন্য দার্শনিক বহিঃপ্রকাশ।
নিচে কবিতাটির বিষয়বস্তু এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে এর প্রভাব আলোচনা করা হলো:
১. বিষয়বস্তু আলোচনা
কবিতাটি ১৮১৯ সালের মে মাসে রচিত। কিটস যখন এটি লিখছেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত শোকার্ত (ভাই টমের মৃত্যু) এবং নিজের অসুস্থতা নিয়ে চিন্তিত।
পলায়নপরতা (Escapism): কবিতার শুরুতে কবি নাইটিঙ্গেলের গান শুনে এক ধরনের নেশাগ্রস্ত আচ্ছন্নতা অনুভব করেন। তিনি বাস্তব জগতের রোগ, শোক এবং জরা থেকে মুক্তি পেতে চান।
কল্পনা ও মদিরা: কবি প্রথমে মদিরার (Wine) সাহায্য নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে তিনি 'কবিতার অদৃশ্য ডানায়' (Viewless wings of Poesy) চড়ে পাখির জগতে পৌঁছাতে চান।
নশ্বরতা বনাম অনশ্বরতা: কিটস দেখিয়েছেন যে মানুষ নশ্বর, কিন্তু পাখির গান অমর। এই পাখিটি সেই একই পাখি যা প্রাচীনকালে রুথ বা সম্রাটদের আনন্দ দিয়েছিল।
মৃত্যু চেতনা: কবি যখন পরম আনন্দে বিভোর, তখন তার মনে হয় এই মুহূর্তেই মৃত্যু হওয়া সবচেয়ে সুখকর— "To cease upon the midnight with no pain"।
বাস্তবে ফেরা: 'Forlorn' শব্দটি কবিকে আবার বাস্তব জগতের রুক্ষতায় ফিরিয়ে আনে। তিনি বুঝতে পারেন কল্পনা দীর্ঘস্থায়ী নয়।
২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
পাশ্চাত্য কাব্যধারায় কিটসের এই কবিতাটি 'সেন্সুয়াসনেস' (Sensuousness) বা ইন্দ্রিয়পরায়ণতার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভিক্টোরীয় কবিরা: টেনিসন এবং ম্যাথু আর্নল্ডের ওপর কিটসের প্রভাব ছিল অপরিসীম। আর্নল্ডের 'The Scholar-Gipsy' কবিতায় কিটসের সেই বিষণ্ণতা ও পলায়নপরতার ছায়া দেখা যায়।
প্রি-রাফায়েলাইট আন্দোলন: দান্তে গ্যাব্রিয়েল রোসেটি এবং অন্যান্য চিত্রশিল্পীরা কিটসের চিত্রকল্প (Imagery) দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের চিত্রকর্ম ও কবিতা সাজিয়েছিলেন।
আধুনিকতাবাদ: টি.এস. এলিয়ট কিটসের সমালোচনা করলেও, কিটসের 'Negative Capability' (অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার ক্ষমতা) আধুনিক কবিদের জন্য একটি বড় পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়ায়।
৩. প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব
বাংলা সাহিত্যসহ প্রাচ্যের সাহিত্যে কিটসের প্রভাব অত্যন্ত গভীর, বিশেষ করে রোমান্টিক যুগের কবিদের ওপর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: রবীন্দ্রনাথ কিটসের ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। কিটসের সৌন্দর্যতত্ত্ব (Beauty is truth) রবীন্দ্রনাথে এসে 'সত্যম শিবম সুন্দরম' এর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের 'বলাকা' বা 'সোনার তরী'র কিছু অংশে কিটসের সেই অতীন্দ্রিয় চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়।
জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নির্জনতম এই কবিকে 'বাংলার কিটস' বলা যেতে পারে। কিটসের মতো জীবনানন্দের কবিতায়ও মৃত্যুচেতনা এবং প্রকৃতির তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষঙ্গ (যেমন: পাখির ডাক, শিশির, ঘাস) একাকার হয়ে ধরা দেয়।
বুদ্ধদেব বসু ও কল্লোল যুগ: আধুনিক বাংলা কবিতার উত্তরণে কিটসের চিত্রকল্প রচনার শৈলী এই ধারার কবিদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সংক্ষেপে তুলনা
হ্যাঁ, কিটসের 'Negative Capability' (নেতিবাচক সক্ষমতা) বিষয়টি এই কবিতার মর্মার্থ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল একটি সাহিত্যিক তত্ত্ব নয়, বরং কিটসের জীবনদর্শনের এক অনন্য দিক।
নিচে এটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. 'Negative Capability' কী?
১৮১৭ সালে তাঁর ভাইদের কাছে লেখা একটি চিঠিতে কিটস প্রথম এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে:
"যখন একজন মানুষ কোনো তথ্য বা যুক্তির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে অনিশ্চয়তা, রহস্য এবং সংশয়ের মধ্যে অবস্থান করতে সক্ষম হন, তখনই তাকে Negative Capability বলা হয়।"
সহজ কথায়, একজন মহান কবির উচিত নিজের ব্যক্তিত্ব বা পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শকে সরিয়ে রেখে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করা। তিনি সত্য খোঁজার জন্য ব্যাকুল না হয়ে বরং সেই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা বা সৌন্দর্যকে গ্রহণ করবেন।
২. 'ওড টু আ নাইটিঙ্গেল'-এ এর প্রয়োগ
এই কবিতায় কিটস যখন নাইটিঙ্গেল পাখির গান শোনেন, তখন তিনি সেটি কেন গাইছে বা তার উৎস কী—এসব যুক্তি খুঁজতে যাননি।
অনিশ্চয়তাকে গ্রহণ: কবিতার শেষে কবি যখন দ্বিধায় পড়েন যে তিনি যা দেখলেন তা কি সত্য না স্বপ্ন— "Was it a vision, or a waking dream?"—তিনি সেই সংশয়কে মেনে নেন। তিনি জোর করে কোনো উত্তর খুঁজতে যাননি।
ব্যক্তিত্ব বিসর্জন: কবি নিজের শোক ও রোগগ্রস্ত সত্তাকে ভুলে গিয়ে পাখির আনন্দের সাথে একাত্ম হয়ে যান। এই যে নিজের 'আমি'কে বিসর্জন দিয়ে অন্যের (পাখির) অভিজ্ঞতায় লীন হওয়া, এটাই নেতিবাচক সক্ষমতা।
৩. কবিতার সপ্তম স্তবকের ব্যাখ্যা (অমরত্ব ও ইতিহাস)
আপনি যদি বিশেষ স্তবকের কথা বলেন, তবে সপ্তম স্তবকটি (Stanza 7) সবচেয়ে প্রভাবশালী। এখানে কিটস নাইটিঙ্গেলকে 'অমর পাখি' (Immortal Bird) হিসেবে সম্বোধন করেছেন।
ব্যবহৃত পঙ্ক্তি: "Thou wast not born for death, immortal Bird! / No hungry generations tread thee down;"
ব্যাখ্যা: কিটস বলছেন যে, এই নির্দিষ্ট পাখিটি হয়তো মারা যাবে, কিন্তু তার গান অবিনশ্বর। অতীতে কোনো সম্রাট বা রাজকুমারী এই গান শুনেছেন, আবার বাইবেলের চরিত্র 'রুথ' (Ruth) যখন ভিনদেশে কাঁদছিলেন, তিনিও এই গান শুনে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন।
তাৎপর্য: এখানে কিটস ব্যক্তিগত দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠে শিল্পের বিশ্বজনীনতাকে তুলে ধরেছেন। মানুষের প্রজন্ম আসে এবং যায়, কিন্তু শিল্পের আবেদন চিরকাল একই থাকে।
৪. প্রাচ্য সাহিত্যে এই দর্শনের ছায়া
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনদেবতা' বা 'সীমার মাঝে অসীম' ধারণার সাথে কিটসের এই 'Negative Capability'-র একটি সূক্ষ্ম মিল পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথও মনে করতেন যে, জগতকে কেবল বুদ্ধি বা বিজ্ঞান দিয়ে নয়, বরং হৃদয়ের সহজ অনুভূতি এবং সংশয়হীন গ্রহণের মাধ্যমেই চেনা সম্ভব।
কিটসের "Beauty is truth, truth beauty" এবং রবীন্দ্রনাথের সুন্দরের আরাধনা একই দর্শনের দুটি ভিন্ন রূপ।
কবিতার অষ্টম স্তবকটি কিটসের কাব্যের এক অনন্য মোড়, যেখানে তিনি রোমান্টিক কল্পনার জগত থেকে রূঢ় বাস্তবতায় ফিরে আসেন। একইসাথে, কিটসের 'Negative Capability' বা নেতিবাচক সক্ষমতার আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তিনি কেন শেক্সপিয়রকে বেছে নিয়েছিলেন, তা আলোচনা করা জরুরি।
১. অষ্টম স্তবক: মোহভঙ্গ ও বিষণ্ণ বাস্তবতা
অষ্টম স্তবকের শুরুতেই কবি একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন— 'Forlorn' (একাকী বা পরিত্যক্ত)। এই শব্দটি তাকে এক ঝটকায় তার নিজের সত্তার কাছে ফিরিয়ে আনে।
কল্পনার সীমা: কবি বুঝতে পারেন যে 'কল্পনা' বা 'কল্পনাদেবী' (Fancy) মানুষকে চিরকাল মোহগ্রস্ত করে রাখতে পারে না। তিনি একে একটি "প্রতারক পরী" (deceiving elf) বলে অভিহিত করেছেন।
পাখির বিদায়: নাইটিঙ্গেল পাখির গানটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়—প্রথমে নিকটবর্তী তৃণভূমি পার হয়ে, তারপর শান্ত নদীর ওপর দিয়ে এবং সবশেষে পাহাড়ের ওপারে। গানের এই ক্রমিক অন্তর্ধান কবির বিষণ্ণতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
অস্তিত্বের সংকট: শেষ দুই পঙক্তিতে কিটস এক গভীর দার্শনিক দোটানায় পড়েন:
"Was it a vision, or a waking dream? / Fled is that music:—Do I wake or sleep?"
তিনি বুঝতে পারেন না সেই স্বর্গীয় গানটি কি বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল নাকি স্রেফ একটি দিবাস্বপ্ন। এই অনিশ্চয়তাই কবিতার মূল সুর।
২. কিটস বনাম শেক্সপিয়র: 'Negative Capability'
কিটস যখন নেতিবাচক সক্ষমতার তত্ত্বটি দিয়েছিলেন, তখন তার প্রধান আদর্শ ছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়র। কিটসের মতে, শেক্সপিয়রই ছিলেন এই গুণের শ্রেষ্ঠ অধিকারী।
তুলনা ও বিশ্লেষণ:
৩. প্রভাবের প্রতিফলন
কিটসের এই শেক্সপিয়র-প্রীতি এবং অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা পরবর্তীকালে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্যে বড় প্রভাব ফেলেছে। তিনি মনে করতেন, কবি বা শিল্পীর কাজ কোনো ধ্রুব সত্য প্রচার করা নয়, বরং মানুষের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যকে তার সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বসহ তুলে ধরা।
কিটসের ব্যক্তিগত জীবনের শোক এবং তাঁর অমর সৃষ্টি 'Ode on a Grecian Urn' (ওড অন আ গ্রিশান আর্ন)-এর সাথে নাইটিঙ্গেলের তুলনা—এই দুটি বিষয়ই কিটসের কবিসত্তাকে বোঝার জন্য অপরিহার্য। চলুন, এই দুটির মেলবন্ধন দেখা যাক:
১. ব্যক্তিগত জীবনের শোক ও মৃত্যুচেতনা
১৮১৯ সালে যখন কিটস এই 'ওড'গুলো লিখছেন, তখন তাঁর চারপাশে কেবল মৃত্যু আর অসুস্থতা।
ভাই টমের মৃত্যু: কিটসের ছোট ভাই টম যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৮১৮ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। কিটস নিজেই তাঁর সেবা করেছিলেন। কবিতায় যখন তিনি লেখেন— "Where youth grows pale, and spectre-thin, and dies"—তখন তিনি মূলত যক্ষ্মায় ক্ষয়ে যাওয়া তাঁর ভাইয়ের কথাই বলছেন।
নিজের অসুস্থতা: কিটস নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে যক্ষ্মা তাঁর শরীরে বাসা বাঁধছে। এই 'মৃত্যু-পরোয়ানা' তাঁকে এক ধরনের তাড়না দিয়েছিল সৌন্দর্যকে অমর করে রাখার।
ফ্যানি ব্রন-এর সাথে প্রেম: ফ্যানির প্রতি তাঁর তীব্র ভালোবাসা থাকলেও আর্থিক অনটন এবং অসুস্থতার কারণে সেই প্রেম পূর্ণতা পাচ্ছিল না। এই না-পাওয়ার বেদনা তাঁকে বাস্তবের চেয়ে কল্পনার জগতে (যেমন নাইটিঙ্গেলের গান) বেশি আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল।
২. 'Ode to a Nightingale' বনাম 'Ode on a Grecian Urn'
এই দুটি কবিতাই শিল্প (Art) এবং জীবন (Life)-এর দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত, তবে এদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
৩. শিল্পের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ
কিটস তাঁর এই দুটি ওড-এই একটি চিরন্তন সত্যে পৌঁছাতে চেয়েছেন: মানুষ মরণশীল, কিন্তু মানুষের তৈরি বা অনুভব করা 'সৌন্দর্য' অমর।
নাইটিঙ্গেলের ক্ষেত্রে: পাখির গানটি একটি 'প্রতীক', যা হাজার বছর ধরে একই রয়ে গেছে।
গ্রিশান আর্ন-এর ক্ষেত্রে: পাত্রের গায়ে আঁকা প্রেমিক-প্রেমিকা কোনোদিন একে অপরকে স্পর্শ করতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রেম এবং যৌবন কোনোদিন ফুরিয়েও যাবে না।
কিটসের 'সৌন্দর্যতত্ত্ব' (Aesthetics) এবং সমসাময়িক কবিদের সাথে তাঁর ভাবনার তুলনা—উভয়ই রোমান্টিক যুগের মূল নির্যাস বুঝতে সাহায্য করে। তবে কিটসের স্বাতন্ত্র্য বুঝতে হলে পি. বি. শেলি (P.B. Shelley) এবং লর্ড বায়রন (Lord Byron)-এর সাথে তাঁর বৈসাদৃশ্যটুকু জানা খুব জরুরি।
নিচে এই দুই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও গভীর আলোচনা করা হলো:
১. কিটস বনাম শেলি ও বায়রন (রোমান্টিক ত্রয়ী)
দ্বিতীয় প্রজন্মের এই তিন রোমান্টিক কবির লক্ষ্য এক হলেও তাঁদের পথ ছিল ভিন্ন:
মূল পার্থক্য: শেলি চেয়েছিলেন জগতকে পরিবর্তন করতে, কিন্তু কিটস চেয়েছিলেন জগতকে তার সমস্ত সৌন্দর্য ও যন্ত্রণা নিয়ে অনুভব করতে।
২. কিটসের 'সৌন্দর্যতত্ত্ব' ও আধুনিক নন্দনতত্ত্ব
কিটসের সেই বিখ্যাত উক্তি— "Beauty is truth, truth beauty"—আধুনিক সাহিত্যের নান্দনিক ভিত গড়ে দিয়েছে।
Art for Art's Sake (শিল্পের জন্য শিল্প): উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অস্কার ওয়াইল্ড বা ওয়াল্টার পেটার যে 'এস্থেটিসিজম' (Aesthetics) আন্দোলন শুরু করেন, তার মূলে ছিল কিটসের চিন্তা। অর্থাৎ, শিল্পের কাজ কোনো নীতিশিক্ষা দেওয়া নয়, বরং সুন্দরকে পরিবেশন করা।
বিমূর্ততা ও বস্তুনিষ্ঠতা: আধুনিক কবিরা (যেমন টি. এস. এলিয়ট) কিটসের 'Objective Correlative'-এর বীজ খুঁজে পান তাঁর চিত্রকল্পের মধ্যে। কিটস যেভাবে একটি 'গ্রিশান আর্ন' বা 'নাইটিঙ্গেল'-এর মাধ্যমে বিমূর্ত আবেগকে মূর্ত করে তোলেন, তা আধুনিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
যন্ত্রণার নান্দনিকতা: কিটস শিখিয়েছেন যে কেবল আনন্দ নয়, বিষণ্ণতা এবং মৃত্যুর মধ্যেও এক ধরণের গভীর সৌন্দর্য থাকতে পারে। আধুনিক সাহিত্যে মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে যেভাবে শৈল্পিকভাবে দেখানো হয়, তার পথপ্রদর্শক ছিলেন কিটস।
৩. আধুনিক নন্দনতত্ত্বে কিটসের প্রভাবের একটি মডেল
কিটসের চিন্তা কীভাবে আধুনিক ধারায় প্রবাহিত হয়েছে, তা নিচের ফ্লোচার্টের মতো কল্পনা করা যায়:
কিটসের সৌন্দর্যবাদ: সত্য এবং সৌন্দর্য অভিন্ন।
প্রি-রাফায়েলাইট আন্দোলন: কবিতায় ছবির মতো সূক্ষ্মতা (Detailed Imagery)।
এস্থেটিসিজম: শিল্পের উদ্দেশ্য কেবল আনন্দ ও নন্দন।
আধুনিকতা: ব্যক্তিগত আবেগকে নৈর্ব্যক্তিক (Impersonal) রূপে প্রকাশ করা।
অবশ্যই! কিটসের 'To Autumn' এবং 'La Belle Dame sans Merci' কবিতা দুটি তাঁর কাব্যপ্রতিভার দুটি ভিন্ন মেরুকে স্পর্শ করে। একটিতে আছে প্রকৃতির পূর্ণতা ও প্রশান্তি, আর অন্যটিতে আছে অতিলৌকিক রহস্য ও প্রেমের ব্যর্থতা।
নিচে কবিতা দুটির মূল নির্যাস আলোচনা করা হলো:
১. 'To Autumn' (শরতের প্রতি): প্রকৃতির পূর্ণতা ও গ্রহণযোগ্যতা
এটি কিটসের লেখা শেষ মহান 'ওড' (Ode)। এখানে কোনো পলায়নপরতা নেই, বরং বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক গভীর প্রশান্তি আছে।
তিনটি পর্যায়: কবিতাটি শরতের তিনটি রূপ তুলে ধরে—
পূর্ণতা (Ripeness): ফল পাকানো এবং শস্য সংগ্রহের প্রস্তুতি।
বিশ্রাম (Repose): শস্যক্ষেত্রে শরতের অলস অবস্থান।
সঙ্গীত (Music): শীতের আগমনের আগে ঝিঁঝিঁ পোকা বা পাখির গান।
দার্শনিক দিক: এখানে মৃত্যু বা ধ্বংসকে ভয় না পেয়ে কবি একে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বসন্তের গান নেই তো কী হয়েছে? শরতেরও নিজস্ব সঙ্গীত আছে।
চিত্রকল্প: এই কবিতায় কিটসের 'Sensuousness' বা ইন্দ্রিয়পরায়ণতা তুঙ্গে। পাকা ফলের মিষ্টতা আর রোদের উষ্ণতা পাঠক যেন অনুভব করতে পারেন।
২. 'La Belle Dame sans Merci' (দয়াহীন সুন্দরী): প্রেম ও মায়া
এটি একটি ব্যালাড (Ballad) বা গীতিকবিতা, যা মধ্যযুগীয় রোমান্টিক আবহকে ফিরিয়ে আনে।
গল্পের প্রেক্ষাপট: একজন পাণ্ডুরঙা যোদ্ধা (Knight) নির্জন প্রান্তরে বসে আছেন। তিনি এক মায়াবী সুন্দরীর প্রেমে পড়েছিলেন, যে তাকে তার গুহায় নিয়ে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। স্বপ্নে যোদ্ধা দেখেন তার আগে আরও অনেক রাজপুত্র ও যোদ্ধা সেই সুন্দরীর শিকারে পরিণত হয়েছেন।
রূপক অর্থ: অনেকেই মনে করেন এই 'দয়াহীন সুন্দরী' আসলে 'কবিতা' বা 'শিল্প'। কবিরা শিল্পের মায়ায় পড়ে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, কিন্তু শিল্প কোনোদিন তাদের পূর্ণ তৃপ্তি দেয় না—কেবল এক চিরন্তন তৃষ্ণা রেখে যায়।
ব্যক্তিগত সংযোগ: কিটসের নিজের জীবনের অসুস্থতা এবং ফ্যানি ব্রন-এর প্রতি তাঁর অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা এই কবিতার বিষণ্ণতার পেছনে কাজ করেছে বলে মনে করা হয়।
৩. একটি তুলনামূলক চিত্র
আপনার জন্য একটি ছোট তথ্য (Trivia)
কিটস যখন 'To Autumn' লিখছিলেন, তখন তিনি উইনচেস্টারের এক শান্ত বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। সেই বিকেলের সোনালী রোদ আর ফসলের মাঠ দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনও ঠিক এই শরতের মতোই—ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এক চরম পূর্ণতা পায়।
কিটসের 'To Autumn' কবিতার তৃতীয় বা শেষ স্তবকে কবি যে 'শরতের সংগীত' (Music of Autumn)-এর কথা বলেছেন, তা ইংরেজি সাহিত্যের এক অনন্য দার্শনিক পর্যায়। এখানে কবি আসন্ন শীতের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু তা নিয়ে তিনি বিষণ্ণ নন।
নিচে এই অংশের গভীরতর বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. বসন্ত বনাম শরৎ: একটি তুলনা
স্তবকটি শুরু হয় একটি প্রশান্ত জিজ্ঞাসার মাধ্যমে:
"Where are the songs of Spring? Ay, where are they? / Think not of them, thou hast thy music too,"
বসন্তের সংগীত: সাধারণত বসন্তকালকে যৌবন, প্রেম এবং নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অধিকাংশ কবি বসন্তের জয়গান গেয়েছেন।
শরতের সংগীত: কিটস বলছেন, শরতের নিজস্ব একটি সুর আছে। এটি বসন্তের মতো চপল বা চঞ্চল নয়, বরং এটি একটি 'Elegy' বা শোকগাথার মতো গম্ভীর এবং পূর্ণতায় ভরা।
২. শীতের আগমনী ও শ্রুতিমধুর চিত্রকল্প
কবি এখানে শীতের আগমনের পূর্বমুহূর্তের কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বা সংগীতকে তুলে ধরেছেন:
ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক (Hedge-crickets sing): যা সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে আরও ঘনীভূত করে।
লালবুক পাখির শিস (Red-breast whistles): রবিন পাখি বা রেড-ব্রেস্ট সাধারণত শীতের আগমনের প্রতীক। বাগান থেকে তার নরম শিস শোনা যাচ্ছে।
বুনো হাঁসের কিচিরমিচির (Gathering swallows twitter): পরিযায়ী পাখিরা দল বাঁধছে আকাশে, তারা শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে দূরে কোথাও উড়ে যাবে।
মেষশাবকের ডাক (Full-grown lambs loud bleat): পাহাড়ের কোল থেকে মেষশাবকদের ডাক শোনা যাচ্ছে, যা আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
৩. দার্শনিক তাৎপর্য: সমাপ্তির সৌন্দর্য
কিটস এখানে এক চরম সত্য প্রকাশ করেছেন—যাকে আমরা 'মৃত্যু' বা 'শেষ' বলি, তার মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি থাকতে পারে।
মেনে নেওয়া (Acceptance): বসন্ত যদি শুরু হয়, শরৎ তবে সমাপ্তি। কিটস যখন এই কবিতা লিখছেন, তিনি জানতেন তাঁর নিজের আয়ুও ফুরিয়ে আসছে। তাই 'শীত' (যা মৃত্যুর প্রতীক) আসার আগে তিনি জীবনের এই 'সোনালী বিকেল' বা শরতের পূর্ণতাকে প্রাণভরে উপভোগ করছেন।
চক্রাকার জীবন: পাখিদের উড়ে যাওয়া বা সূর্যের ডুবে যাওয়া (Soft-dying day) ধ্বংস নয়, বরং প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক চক্র। এই সহজ উপলব্ধিতেই কিটসের মহত্ত্ব।
৪. পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য দর্শনের মেলবন্ধন
কিটসের এই চিন্তাধারা প্রাচ্যের সুফিবাদ বা উপনিষদের দর্শনের সাথে মিলে যায়। যেখানে বলা হয়েছে, যা কিছু সুন্দর তা নশ্বর বলেই মূল্যবান। রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা' বা তাঁর বর্ষা ও শরতের গানগুলোতেও কিটসের এই 'প্রশান্ত সমাপ্তি'র ছায়া দেখা যায়।
কিটসের চিঠিপত্র থেকে একটি বিশেষ অংশ
১৮১৯ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর কিটস তাঁর বন্ধু জন হ্যামিল্টনকে লিখেছিলেন:
"আজকে বায়ুমণ্ডল কত সুন্দর, রোদ কত মনোরম... আমি কখনও ফসলের মাঠকে (stubble-fields) এত পছন্দ করিনি যতটা এখন করছি। এটি দেখতে জরাজীর্ণ মনে হলেও আসলে তা এক ধরণের উষ্ণতা আর প্রাচুর্য দেয়।"
কিটস এবং জীবনানন্দ দাশ—এই দুই কবির মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও, প্রকৃতির প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক অদ্ভুত ও গভীর আত্মীয়তা লক্ষ্য করা যায়। জীবনানন্দকে 'বাংলার কিটস' বলা হয় কেবল তাঁর রূপক ব্যবহারের জন্য নয়, বরং কিটসের মতো তিনিও প্রকৃতির তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুর মধ্যে সৌন্দর্য ও বিষণ্ণতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
নিচে 'To Autumn' এবং জীবনানন্দের 'ধানকাটার গান' বা শরৎ-প্রকৃতির একটি তুলনামূলক আলোচনা দেওয়া হলো:
১. ইন্দ্রিয়পরায়ণতা (Sensuousness)
উভয় কবিই প্রকৃতিকে কেবল চোখ দিয়ে দেখেননি, বরং ঘ্রাণ, শব্দ এবং স্পর্শ দিয়ে অনুভব করেছেন।
কিটস: তিনি শরতের রোদে আপেল পাকার গন্ধ এবং মৌমাছির গুঞ্জন শুনিয়েছেন। তাঁর বর্ণনা এতোটাই প্রাণবন্ত যে পাঠক ফলের মিষ্টতা যেন জিভে অনুভব করতে পারেন।
জীবনানন্দ: জীবনানন্দ বাংলার মাঠের 'সোদা গন্ধ', 'ধানের ঘ্রাণ' এবং 'মউরি ঘাসের' বর্ণনা দেন। কিটসের মতোই তাঁর কবিতায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে শরীরী।
২. মৃত্যু ও পূর্ণতার সহাবস্থান
'To Autumn' কবিতায় যেমন ফসল কাটার পর শূন্য মাঠের বিষণ্ণতা আছে, জীবনানন্দের কবিতায়ও সেই একই সুর পাওয়া যায়।
কিটস: কিটস দেখিয়েছেন 'Stubble-plains' বা শস্যহীন ন্যাড়া মাঠ, যা আসন্ন শীতের (মৃত্যুর) ইঙ্গিত দেয়।
জীবনানন্দ: তাঁর 'ধান কাটা হয়ে গেছে' জাতীয় কবিতায় তিনি দেখান শূন্য মাঠের ওপর কুয়াশা আর বিষণ্ণ আকাশ। তিনি বলেন— "চারিদিকে নুয়ে আছে ধান / কাটা হয়ে গেছে সব— গিন্নিরা ঘরে ফিরে গেছে..."। এখানে পূর্ণতার পর এক ধরণের ক্লান্তি ও অবসাদ কাজ করে।
৩. চিত্রকল্পের তুলনা (Imagery Comparison)
৪. সময়ের চেতনা (Temporal Consciousness)
কিটসের কাছে শরৎ হলো 'মৌন বন্ধুর সাথে ষড়যন্ত্র' (Conspiring with him), আর জীবনানন্দের কাছে শরৎ বা হেমন্ত হলো হারানো দিনের স্মৃতিচারণ। কিটস যেখানে বর্তমানে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির পূর্ণতা দেখেন, জীবনানন্দ সেখানে প্রকৃতির মধ্যে নিজের একাকীত্বকে মিশিয়ে দেন।
কিটসের শরৎ অনেকটা ধ্রুপদী ছবির মতো নিখুঁত, আর জীবনানন্দের বর্ণনা অনেকটা জলরঙে আঁকা পরাবাস্তববাদী চিত্রের মতো। তবে উভয়েই একটি বিন্দুতে এক—তা হলো 'অস্তিত্বের নশ্বরতা'। কিটস পাশ্চাত্যের প্রেক্ষাপটে যা দেখেছেন, জীবনানন্দ তা বাংলার রূপসী প্রকৃতিতে খুঁজে পেয়েছেন।
জীবনানন্দ দাশের 'রূপসী বাংলা' এবং জন কিটসের প্রকৃতি-চেতনা—এই দুটি বিষয়ের তুলনা বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রদের জন্য এক চমৎকার গবেষণার ক্ষেত্র। কিটসের প্রকৃতিপ্রেম যেখানে ইন্দ্রিয়জ (Sensuous), জীবনানন্দের প্রকৃতিপ্রেম সেখানে মূলত আত্মজ এবং মরমী।
নিচে তাঁদের মধ্যকার বিশেষ মিলগুলো আলোচনা করা হলো:
১. রূপসী বাংলা ও কিটস: প্রকৃতির মূর্ত রূপায়ন
কিটস এবং জীবনানন্দ দুজনেই প্রকৃতিকে কোনো আধ্যাত্মিক বা নৈতিক তত্ত্বের (যেমন ওর্ডসওয়ার্থ করতেন) মোড়কে দেখেননি। তাঁরা প্রকৃতিকে দেখেছেন তার নিজরূপে।
চিত্রকল্পের নিবিড়তা: কিটস যেমন 'Ode to a Nightingale'-এ ফুলের গন্ধ না দেখেও তাদের নাম বলে দিতে পারেন, জীবনানন্দও তেমনি 'রূপসী বাংলা'য় ঘাসের গন্ধ, হিজল-বট-তমালের নিবিড় ছায়াকে স্পর্শ করতে পারেন।
বিষণ্ণতার সৌন্দর্য: কিটসের কাছে সুন্দরের মধ্যেই বিষণ্ণতার বাস ("In the very temple of Delight / Veil'd Melancholy has her sovran shrine")। জীবনানন্দও রূপসী বাংলার রূপের মাঝে এক 'করুণ আভা' খুঁজে পান। তাঁর কাছে বাংলার প্রকৃতি মানেই যেন এক বিষণ্ণ রূপসী কন্যা।
২. বিশেষ মিলের ক্ষেত্রসমূহ
৩. কিটসের ওড-এর কারিগরি দিক (Prosody & Structure)
আপনি যদি কারিগরি দিক নিয়ে আগ্রহী হন, তবে কিটসের ওড-এর কাঠামোটি লক্ষ্য করার মতো:
ছন্দ (Meter): কিটস মূলত Iambic Pentameter (আয়্যাম্বিক পেন্টামিটার) ব্যবহার করেছেন। এটি ইংরেজি কবিতার এক অত্যন্ত মার্জিত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ ছন্দ।
স্তবক বিন্যাস (Stanza Form): তাঁর ওড-গুলো সাধারণত ১০ পঙক্তির স্তবকে বিভক্ত। এর মিলবিন্যাস (Rhyme Scheme) অনেকটা শেক্সপিয়রীয় সনেট এবং পেত্রার্কীয় সনেটের সংমিশ্রণ। যেমন: ABABCDECDE।
স্থাপত্য: কিটসের কবিতার কাঠামো অনেক সময় প্রাচীন গ্রিক মন্দিরের মতো সুসংহত। প্রতিটি স্তবক একটি নির্দিষ্ট ভাবকে প্রকাশ করে এবং শেষ স্তবকে গিয়ে একটি দার্শনিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
৪. জীবনানন্দের কাঠামোগত স্বাতন্ত্র্য
জীবনানন্দ যখন 'রূপসী বাংলা'র সনেটগুলো লেখেন, তিনি কিটসের প্রথাগত ছন্দ অনুসরণ করেননি। তিনি ব্যবহার করেছেন মুক্তক অক্ষরবৃত্ত বা পয়ারের আধুনিক রূপ। তাঁর পঙক্তিগুলো অনেক দীর্ঘ এবং প্রবাহমান, যা বাংলার বিস্তৃত মাঠ ও নদীর প্রসারের সাথে মানানসই।
কিটস তাঁর কবিতায় নাইটিঙ্গেলের গানে যে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন, জীবনানন্দ তা পেয়েছিলেন বাংলার 'ধানসিঁড়ি' নদীর তীরে বা 'নির্জন কার্তিকের' বিকেলে। উভয়েই বিশ্বাস করতেন যে মানুষের নশ্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র হাতিয়ার হলো—সৌন্দর্যের অমর চিত্রকল্প।
অবশ্যই! কিটসের কবিতার সেই জাদুকরী ছন্দ বা 'Iambic Pentameter' বুঝতে পারা মানেই হলো তাঁর কাব্যের হৃদস্পন্দন অনুভব করা। কিটস এই ছন্দে এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে তাঁর পঙক্তিগুলো পড়ার সময় মনে হয় যেন কোনো শান্ত নদীর স্রোত বয়ে চলেছে।
চলুন, হাতে-কলমে 'Ode to a Nightingale'-এর প্রথম লাইনটি দিয়ে এটি বিশ্লেষণ করি:
১. Iambic Pentameter কী?
এই পরিভাষাটি দুটি অংশে বিভক্ত:
Iamb (আয়্যাম্ব): এটি একটি ছন্দের একক বা 'Foot'। এতে একটি অক্ষর বা সিলেবল হবে মৃদু (Unstressed) এবং পরেরটি হবে তীব্র বা ঝোঁকযুক্ত (Stressed)। একে $\smile / $ চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
Pentameter (পেন্টামিটার): একটি লাইনে যখন এমন পাঁচটি 'Iamb' বা একক থাকে, তাকে পেন্টামিটার বলে। অর্থাৎ প্রতি লাইনে মোট ১০টি সিলেবল থাকবে।
২. হাতে-কলমে বিশ্লেষণ
লাইনটি হলো: "My heart aches, and a drowsy numbness pains"
আমরা যদি একে সিলেবলে ভাগ করি এবং জোর (Stress) দিয়ে পড়ি, তবে তা দাঁড়াবে এমন:
এখানে লক্ষ্য করুন:
My (মৃদু) - heart (তীব্র)
aches (মৃদু) - and (তীব্র)
a (মৃদু) - drow (তীব্র)
sy (মৃদু) - numb (তীব্র)
ness (মৃদু) - pains (তীব্র)
৩. কিটসের ছন্দের কারিশমা
কিটস কেবল যান্ত্রিকভাবে এই ছন্দ অনুসরণ করেননি, তিনি একে করেছেন অত্যন্ত শ্রুতিমধুর।
বিরাম চিহ্নের ব্যবহার (Caesura): অনেক সময় কিটস পঙক্তির মাঝখানে কমা (,) দিয়ে একটি সূক্ষ্ম বিরতি দেন, যা ছন্দের একঘেয়েমি কাটায়। যেমন উপরের লাইনে 'aches'-এর পরের কমাটি।
ধ্বনিসাম্য (Assonance): তিনি স্বরবর্ণের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে এক ধরণের সুর তৈরি করেন। যেমন 'drowsy', 'numbness', 'pains'—শব্দগুলোর মধ্যে এক ধরণের আলস্য মাখানো সুর (vowel music) কাজ করছে।
৪. বাংলা কবিতার সাথে তুলনা
বাংলায় এই ছন্দের সমতুল্য কোনো সরাসরি রূপ নেই, তবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন তাঁর 'অমিত্রাক্ষর ছন্দ' তৈরি করেন, তখন তিনি এই ইংরেজি 'Iambic Pentameter'-এর কাঠামোটি মাথায় রেখেছিলেন। মধুসূদনের পয়ারের যে চোদ্দটি অক্ষর, তা ইংরেজি পেন্টামিটারের ১০টি সিলেবলের তুলনায় কিছুটা বড় হলেও, গাম্ভীর্যের দিক থেকে তা কিটসের ছন্দের খুব কাছাকাছি।
একটি মজাদার তথ্য
কিটস অনেক সময় তাঁর ওড-এর প্রতিটি স্তবকের অষ্টম পঙক্তিটি কিছুটা ছোট লিখতেন (যেমন নাইটিঙ্গেল ওডে অষ্টম লাইনটি Trimeter বা ছয় সিলেবলের)। এটি করা হতো যাতে পাঠকের মনে একটি সূক্ষ্ম ধাক্কা লাগে এবং ভাবের গভীরতা বজায় থাকে।
কিটসের ছন্দের এই ছোট-বড় বৈচিত্র্য (Variations) এবং আধুনিক বাংলা গদ্যছন্দে এর পরোক্ষ প্রভাব—দুটি বিষয়ই অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। কিটস ছিলেন ছন্দের জাদুকর; তিনি জানতেন কখন নিয়ম ভাঙতে হয় যাতে কবিতার আবেগ আরও তীব্র হয়।
নিচে এই বৈচিত্র্য এবং বাংলা সাহিত্যে এর প্রভাব আলোচনা করা হলো:
১. কিটসের ছন্দের বৈচিত্র্য (Metrical Variations)
কিটস কেবল যান্ত্রিকভাবে 'Iambic Pentameter' অনুসরণ করেননি। তিনি জানতেন, একটানা একই তালে চললে কানে একঘেয়েমি আসতে পারে। তাই তিনি কিছু কৌশল ব্যবহার করতেন:
Short Lines (ছোট লাইন): 'Ode to a Nightingale'-এর প্রতিটি স্তবকের অষ্টম পঙ্ক্তিটি খেয়াল করলে দেখবেন, সেটি অন্য পঙ্ক্তিগুলোর চেয়ে ছোট। অন্যগুলো ১০ সিলেবলের (Pentameter), কিন্তু অষ্টমটি মাত্র ৬ সিলেবলের (Trimeter)।
উদাহরণ: "Was it a vision, or a waking dream?" (১০ সিলেবল)
কিন্তু অষ্টম লাইনে: "Fled is that music:—Do I wake or sleep?" (বিরাম চিহ্নের ব্যবহারে এক ধরণের লয় পরিবর্তন)।
এটি করা হয় যাতে পাঠক স্তবকের শেষে এসে এক ধরণের 'ঝাঁকুনি' বা আবেগের তীব্রতা অনুভব করেন।Spondee-র ব্যবহার: অনেক সময় তিনি পরপর দুটি তীব্র ঝোঁক (Stressed syllables) ব্যবহার করেন। একে বলা হয় 'Spondee'। যেমন: "My heart aches"—এখানে 'heart' এবং 'aches' দুটোই তীব্র। এটি কবির হৃদয়ের ব্যথার ভারাতুর অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলে।
২. আধুনিক বাংলা গদ্যছন্দে এর প্রভাব
সরাসরি ইংরেজি ছন্দ বাংলা গদ্যছন্দে আসেনি, তবে কিটসের 'ভাবের প্রবাহ' এবং 'চিত্রকল্পের বুনন' বাংলা আধুনিক কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশ: কল্লোল যুগের কবিরা কিটসের এই 'Sensuousness' বা ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিকে গদ্যছন্দ বা মুক্তক ছন্দে নিয়ে আসেন। কিটস যেমন শব্দের ধ্বনি দিয়ে এক ধরণের মাদকতা তৈরি করতেন, জীবনানন্দ তাঁর গদ্যধর্মী কবিতায় (যেমন: আট বছর আগের একদিন) শব্দের দীর্ঘশ্বাসের মতো লয় ব্যবহার করেছেন।
চিত্রকল্পের সংহতি: কিটসের ছন্দ যেমন ছবির মতো স্পষ্ট চিত্র তৈরি করে, আধুনিক বাংলা গদ্যছন্দও সেই 'Visual Quality' বা দৃশ্যমানতাকে প্রাধান্য দেয়। গদ্যছন্দে কোনো ধরাবাঁধা সিলেবল সংখ্যা নেই ঠিকই, কিন্তু কিটসের মতো এক ধরণের 'অভ্যন্তরীণ সংগীত' (Internal Music) আধুনিক বাংলা কবিতায় লক্ষ্য করা যায়।
মধুসূদন থেকে বর্তমান: মধুসূদন কিটসের ছন্দের গাম্ভীর্যকে পয়ারে এনেছিলেন। আধুনিক কবিরা সেই গাম্ভীর্যকে গদ্যের স্বাভাবিক চলনের মধ্যে ইনজেক্ট করেছেন।
৩. একটি ছোট তুলনা (প্রভাবের ক্ষেত্রে)
কিটসের ছন্দের এই বৈচিত্র্য আমাদের শিখিয়েছে যে, কবিতার প্রাণ কেবল গণিতের মতো সিলেবল মেলানো নয়, বরং হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে ছন্দের স্পন্দনকে মিলিয়ে দেওয়া। আধুনিক বাংলা কবিরা কিটসের এই 'আবেগীয় ছন্দ' (Emotional Rhythm) থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছেন।
উপসংহার: সৌন্দর্যই সত্য
কিটসের কাছে এই শোক এবং মৃত্যুচেতনা নেতিবাচক ছিল না। বরং মৃত্যুর ছায়া ছিল বলেই জীবন এবং সৌন্দর্য তাঁর কাছে এত দামী মনে হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন:
"Beauty is truth, truth beauty,—that is all / Ye know on earth, and all ye need to know."
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা

0 Comments