William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:

 


William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads  :  বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং এস.টি. কোলরিজের যৌথ প্রয়াস 'লিরিক্যাল ব্যালাডস' (Lyrical Ballads) ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৭৯৮ সালে এর প্রকাশনা ইংরেজি সাহিত্যে 'রোমান্টিক পুনর্জাগরণ'-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে গণ্য করা হয়।

নিচে এর বিষয়বস্তু এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে এর প্রভাব আলোচনা করা হলো:


১. 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর মূল বিষয়বস্তু

এই কাব্যগ্রন্থের মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত কৃত্রিম কাব্যভাষা বর্জন করে সাধারণ মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে কবিতার মূল উপজীব্য করে তোলা। এর বিষয়বস্তুকে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়:

  • প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন (ওয়ার্ডসওয়ার্থ): তিনি তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে তুলেছিলেন। গ্রাম্য জীবন, কৃষক, অবহেলিত শিশু এবং প্রকৃতির শান্ত রূপ ছিল তাঁর কবিতার প্রাণ। যেমন: 'Lines Written a Few Miles above Tintern Abbey'.

  • অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃত জগত (কোলরিজ): কোলরিজ অলৌকিক ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তা বাস্তব বলে মনে হয় (যাকে তিনি বলতেন 'willing suspension of disbelief' )। তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান: 'The Rime of the Ancient Mariner'.

  • কাব্যভাষা: ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর বিখ্যাত 'Preface'-এ বলেছিলেন যে, কবিতার ভাষা হওয়া উচিত "মানুষের ব্যবহৃত সাধারণ ভাষা" (language really used by men)।


২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

পাশ্চাত্য বা ইউরোপীয় সাহিত্যে 'লিরিক্যাল ব্যালাডস' একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল:

  • নব্য-ক্লাসিকাল যুগের অবসান: পোপ বা ড্রাইডেনের যুগের কঠোর নিয়ম এবং কৃত্রিমতাকে ভেঙে এই কাব্যগ্রন্থ আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকে প্রাধান্য দেয়।

  • রোমান্টিক আন্দোলনের ভিত্তি: কিটস, শেলি এবং বায়রনের মতো পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য এটি পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।

  • গণতান্ত্রিক চেতনা: রাজাবাদশা বা বীরদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে সাহিত্যের নায়ক হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে সাহিত্যে এক ধরণের 'গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠিত হয়।


৩. প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভাব (বিশেষত বাংলা সাহিত্যে)

প্রাচ্য তথা ভারতীয় সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী:

  • বিহারীলাল চক্রবর্তী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বাংলা গীতি কবিতার জনক বিহারীলাল এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিসর্গ চেতনা ও আধ্যাত্মিকতার মূলে ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতির দর্শনের (Pantheism) ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

  • কাব্যভাষার পরিবর্তন: বাংলা সাহিত্যেও একসময় সংস্কৃতঘেঁষা গুরুগম্ভীর ভাষার আধিপত্য ছিল। 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর প্রভাবে কবিরা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি কাব্যভাষা তৈরির প্রেরণা পান।

  • জীবনানন্দ দাশ ও প্রকৃতি: পরবর্তীকালে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় প্রকৃতির যে নির্জন ও রহস্যময় রূপ ফুটে উঠেছে, তাতে কোলরিজ ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের রোমান্টিক সংবেদনের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।


সংক্ষেপে প্রভাবের ছক:

ক্ষেত্র

প্রভাবের প্রকৃতি

দৃষ্টিভঙ্গি

যুক্তিবাদ বনাম আবেগ এবং কল্পনার প্রাধান্য।

চরিত্র

অভিজাত সমাজ থেকে সাধারণ গ্রাম্য মানুষে রূপান্তর।

প্রকৃতি

প্রকৃতিকে কেবল পটভূমি নয়, বরং এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে দেখা।

ভাষা

কৃত্রিম অলঙ্কার বর্জন করে সহজ ও সরল ভাষার ব্যবহার।


স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের লেখা 'দ্য রাইম অফ দ্য অ্যানশেন্ট মেরিনার' (The Rime of the Ancient Mariner) কেবল 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর প্রথম কবিতাই নয়, এটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রহস্যময় ও প্রতীকী কবিতা।

এই কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু এবং এর গভীরে থাকা বার্তা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:


১. মূল কাহিনী (The Plot)

কবিতাটি শুরু হয় একজন বৃদ্ধ নাবিককে দিয়ে, যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা জনৈক অতিথিকে থামিয়ে তার এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার গল্প শোনায়:

  • অ্যালবাট্রস পাখি হত্যা: মেরিনার (নাবিক) এবং তার সঙ্গীরা যখন বরফের দেশে পথ হারিয়েছিলেন, তখন একটি শুভ্র অ্যালবাট্রস (Albatross) পাখি তাদের কাছে আশার প্রতীক হয়ে আসে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই নাবিক পাখিটিকে ধনুকের তীরের আঘাতে হত্যা করেন।

  • অভিশাপ ও দুর্ভোগ: প্রকৃতির এই পবিত্র প্রতীককে হত্যার ফলে নাবিকদের ওপর অভিশাপ নেমে আসে। মাঝ সমুদ্রে বাতাস বন্ধ হয়ে যায়, পানীয় জলের অভাব দেখা দেয়। কবিতার সেই বিখ্যাত লাইন— "Water, water, everywhere, / Nor any drop to drink."

  • মৃত্যু ও জীবন-মৃত্যু: জাহাজের অন্য সব নাবিক মারা গেলেও বৃদ্ধ নাবিক বেঁচে থাকেন এক ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। তিনি চারিদিকে কেবল পচাগলা মৃতদেহ এবং সাপের মতো জলজ প্রাণী দেখতে পান।

  • মুক্তি ও অনুশোচনা: যখন নাবিক সমুদ্রের সাপগুলোর সৌন্দর্য অনুভব করেন এবং অবচেতনভাবে তাদের আশীর্বাদ করেন, তখন তাঁর গলা থেকে মৃত অ্যালবাট্রস পাখিটি (যা তাঁর পাপের প্রতীক হিসেবে ঝোলানো ছিল) সমুদ্রে খসে পড়ে। তিনি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে মুক্তি পান।


২. মূল ভাববস্তু ও দর্শন

এই কবিতাটি কেবল একটি ভূতুড়ে গল্প নয়, এর পেছনে কিছু গভীর দার্শনিক সত্য লুকিয়ে আছে:

  1. প্রকৃতি ও ঈশ্বর: কোলরিজ দেখাতে চেয়েছেন যে ঈশ্বর তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই বাস করেন। প্রকৃতির কোনো ক্ষতি করা মানে ঈশ্বরেরই অপমান করা।

  2. পাপ ও প্রশ্চিত্ত (Sin and Retribution): কোনো কারণ ছাড়া পাখিটিকে হত্যা করা ছিল একটি 'মূল পাপ'। নাবিকের একাকীত্ব ও মানসিক যন্ত্রণা ছিল তাঁর প্রশ্চিত্ত।

  3. সার্বজনীন ভালোবাসা: কবিতার শেষে নাবিক একটি চিরন্তন সত্য বলে যান—
    "He prayeth best, who loveth best / All things both great and small." (অর্থাৎ, সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে ভালো প্রার্থনা করেন, যিনি ঈশ্বরের ছোট-বড় সব সৃষ্টিকে ভালোবাসেন।)


৩. প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য

  • চিত্রকল্প (Imagery): কোলরিজ এমনভাবে বর্ণনা দিয়েছেন যে পাঠক চোখের সামনে নীল সমুদ্র, বরফ এবং ধুধু মরুভূমির মতো স্থির জাহাজ দেখতে পান।

  • অতিপ্রাকৃত উপাদান: আত্মা, কঙ্কাল-জাহাজ এবং অলৌকিক শক্তির ব্যবহার কবিতাটিকে এক গা ছমছমে রোমাঞ্চকর রূপ দিয়েছে।

কোলরিজের 'The Rime of the Ancient Mariner' কবিতায় অ্যালবাট্রস (Albatross) পাখিটি কেবল একটি সামুদ্রিক পাখি নয়, এটি গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রতীকের বাহক। কেন একে যিশু খ্রিস্ট বা পবিত্রতার প্রতীক বলা হয়, তার কিছু শক্তিশালী কারণ নিচে দেওয়া হলো:


১. যিশু খ্রিস্টের প্রতীক হিসেবে অ্যালবাট্রস

কোলরিজ এই কবিতায় অ্যালবাট্রসকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা যিশু খ্রিস্টের জীবনের সাথে মিলে যায়:

  • ত্রাতা হিসেবে আগমন: নাবিকরা যখন বরফের গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছিল এবং মৃত্যুর প্রহর গুনছিল, তখন কুয়াশা চিরে অ্যালবাট্রস পাখিটি আসে। নাবিকরা তাকে 'Christian soul' হিসেবে স্বাগত জানায়। যেমন যিশু মানবজাতিকে রক্ষা করতে এসেছিলেন, তেমনি পাখিটি নাবিকদের জন্য সুবাতাস ও মুক্তির পথ নিয়ে এসেছিল।

  • নিরপরাধী হত্যা (Innocent Sacrifice): যিশু যেমন কোনো অপরাধ না করেই ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, অ্যালবাট্রসটিও কোনো ক্ষতি না করা সত্ত্বেও নাবিকের তীরের আঘাতে মারা যায়। এটি একটি 'wanton act' বা অহেতুক নিষ্ঠুরতার প্রতীক।

  • ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সাদৃশ্য: পাখিটিকে হত্যার পর যখন দুর্যোগ নেমে আসে, তখন অন্য নাবিকরা রাগের মাথায় মৃত পাখিটিকে বৃদ্ধ নাবিকের গলায় ঝুলিয়ে দেয়।
    "Instead of the cross, the Albatross / About my neck was hung." এখানে সরাসরি 'Cross' বা ক্রুশের উল্লেখ করা হয়েছে। পাখিটি নাবিকের পাপের বোঝা হয়ে তাঁর ঘাড়ে ঝুলে থাকে, যা যিশুর ক্রুশ বহন করার যন্ত্রণার কথা মনে করিয়ে দেয়।


২. পবিত্রতা ও প্রকৃতির প্রতীক

পাখিটি কেবল খ্রিস্টীয় প্রতীক নয়, এটি প্রকৃতির পবিত্রতারও প্রতিনিধি:

  • নিস্পাপ সত্তা: সাদা রঙের অ্যালবাট্রস পবিত্রতা ও শান্তির প্রতীক। একে হত্যা করা মানে প্রকৃতির নিয়মের (Universal Law) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।

  • প্রকৃতির অভিশাপ: একে হত্যার পর সমুদ্র স্থির হয়ে যায় এবং রক্তবর্ণ সূর্যের নিচে জাহাজটি আটকে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র অংশকে আঘাত করা মানে সমগ্র সৃষ্টিতত্ত্বকে আঘাত করা।


৩. অনুশোচনা ও মুক্তি

যিশু যেমন মানুষের পাপ মোচনের পথ দেখান, তেমনি অ্যালবাট্রসের মৃত্যু নাবিককে অনুশোচনার আগুনে পুড়িয়ে পরিশ্রুত করে। যখন নাবিক সমুদ্রের কিটদের (water-snakes) মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে পান এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেন, তখনই তাঁর গলা থেকে পাখিটি (পাপের প্রতীক) খসে পড়ে। এটি আধ্যাত্মিক পুনর্জন্মের লক্ষণ।

অ্যালবাট্রসের রূপক ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত চমৎকার এবং গভীর। কোলরিজ যেখানে অলৌকিকতা আর পাপ-পুণ্যের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে প্রকৃতিকে দেখিয়েছেন, সেখানে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের 'Tintern Abbey' (পুরো নাম: Lines Composed a Few Miles above Tintern Abbey) প্রকৃতিকে দেখার এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং প্রশান্ত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

নিচে কবিতাটির মূল দর্শন এবং প্রকৃতিকে 'মা' ও 'শিক্ষক' হিসেবে দেখার বিষয়টি আলোচনা করা হলো:


১. 'Tintern Abbey'-তে প্রকৃতির তিনটি পর্যায়

ওয়ার্ডসওয়ার্থ এই কবিতায় প্রকৃতির সাথে তাঁর সম্পর্কের বিবর্তনকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন:

  • শৈশব (The Coarser Pleasures): যখন তিনি কেবল শারীরিক আনন্দের জন্য প্রকৃতিতে ছুটে বেড়াতেন। প্রকৃতি ছিল তাঁর কাছে এক চমৎকার খেলার মাঠ।

  • যৌবন (Aching Joys and Giddy Raptures): যখন তিনি প্রকৃতির রূপ-রঙ-শব্দে মুগ্ধ হতেন, কিন্তু এর পেছনের গভীরতা বুঝতেন না।

  • পরিণত বয়স (Maturity): পাঁচ বছর পর যখন তিনি আবার টিনটার্ন অ্যাবে-র তীরে ফিরে আসেন, তখন তিনি প্রকৃতির মধ্যে এক 'ঐশ্বরিক অস্তিত্ব' (Divine Presence) অনুভব করেন।


২. প্রকৃতি যখন 'মা' ও 'নার্স' (Nature as a Mother and Nurse)

ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রকৃতিকে কেবল জড় বস্তু হিসেবে দেখেননি, বরং একে একজন পরমাত্মীয় হিসেবে দেখেছেন:

  • নিরাময়কারী শক্তি: যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল এবং একঘেয়েমি যখন কবিকে ক্লান্ত করে তোলে, তখন প্রকৃতির স্মৃতি তাঁকে শান্তি দেয়। তিনি প্রকৃতিকে বলেছেন "The nurse, / The guide, the guardian of my heart, and soul / Of all my moral being."

  • মমতা ও সুরক্ষা: মা যেমন সন্তানকে আগলে রাখেন, প্রকৃতিও তেমনি কবিকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং তাঁর আত্মাকে প্রশান্তি দেয়।


৩. প্রকৃতি যখন 'শিক্ষক' (Nature as a Teacher)

এই কবিতায় ওয়ার্ডসওয়ার্থের 'প্যান্থেইজম' (Pantheism) বা 'সর্বেশ্বরবাদ' ফুটে উঠেছে। তাঁর কাছে প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক:

  • গভীর সত্যের দর্শন: তিনি প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে বসে এক ধরণের ঘোরের (trance) মধ্যে চলে যান, যেখানে তিনি "see into the life of things" অর্থাৎ বস্তুর অন্তরাত্মাকে দেখতে পান।

  • নৈতিক শিক্ষা: প্রকৃতি কবিকে স্বার্থহীন ভালোবাসা এবং দয়া শিখিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবাসলে সে কখনো তাঁর ভক্তকে হতাশ করে না ("Nature never did betray / The heart that loved her" )।


৪. কোলরিজ বনাম ওয়ার্ডসওয়ার্থ: প্রধান পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য

কোলরিজ (The Ancient Mariner)

ওয়ার্ডসওয়ার্থ (Tintern Abbey)

প্রকৃতির রূপ

ভয়ংকর, রহস্যময় এবং অলৌকিক।

শান্ত, দয়ালু এবং আধ্যাত্মিক।

মনুষ্য অবস্থান

মানুষ প্রকৃতির ভিকটিম বা অপরাধী।

মানুষ প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বা বন্ধু।

মূল বার্তা

প্রকৃতির আইন ভাঙলে শাস্তি অনিবার্য।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে মুক্তি ও মানসিক শান্তি।

হ্যাঁ, 'Tintern Abbey' কবিতার শেষ অংশে তাঁর বোন ডরোথি ওয়ার্ডসওয়ার্থের উপস্থিতি কবিতাটিকে এক অনন্য মানবিক ও আবেগঘন মাত্রা দিয়েছে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ কেন ডরোথিকে এই আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অংশীদার করতে চেয়েছিলেন, তা বোঝা খুব জরুরি:


১. ডরোথির মধ্যে নিজের অতীতকে দেখা

পাঁচ বছর পর টিনটার্ন অ্যাবেতে ফিরে এসে ওয়ার্ডসওয়ার্থ যখন নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন অনুভব করেন, তখন তিনি ডরোথির চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের 'শৈশব' বা 'প্রথম যৌবনের' সেই উদ্দাম প্রকৃতি-প্রেমকে খুঁজে পান। তিনি ডরোথিকে বলছেন:

"In thy voice I catch / The language of my former heart, and read / My former pleasures in the shooting lights / Of thy wild eyes."

অর্থাৎ, ডরোথি বর্তমানে প্রকৃতির যে বন্য আনন্দে মেতে আছেন, কবি একসময় ঠিক তেমনই ছিলেন। ডরোথি এখানে কবির অতীতের এক জীবন্ত আয়না (Mirror)।


২. প্রকৃতির আশীর্বাদ ও সুরক্ষা (Prayer for Dorothy)

ওয়ার্ডসওয়ার্থ জানতেন যে মানুষের জীবন সবসময় সুখের হয় না; বার্ধক্য, একাকীত্ব বা জাগতিক দুঃখ মানুষকে ঘিরে ধরে। তাই তিনি ডরোথির জন্য প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করেন:

  • স্মৃতি যখন ঔষধ: কবি চান, ডরোথি যেন এই সুন্দর মুহূর্তগুলো তাঁর স্মৃতিতে জমা রাখেন। ভবিষ্যতে যখন তিনি একা থাকবেন বা কোনো কষ্টে থাকবেন, তখন এই প্রকৃতির স্মৃতি তাঁকে নিরাময় (Healing) দেবে।

  • প্রকৃতির বিশ্বাসঘাতকতা না করা: তিনি ডরোথিকে আশ্বস্ত করেন যে— "Nature never did betray / The heart that loved her." অর্থাৎ, প্রকৃতি কখনোই তাঁর ভক্তকে ধোঁকা দেয় না। মানুষের নিষ্ঠুরতা বা জগতের স্বার্থপরতা ডরোথির মনকে বিষিয়ে দিলেও প্রকৃতি তাঁকে শান্তি দেবে।


৩. স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ডরোথি (Dorothy as a Living Monument)

কবি মনে করেন, তিনি যখন এই পৃথিবীতে থাকবেন না, তখন ডরোথি তাঁর এই প্রকৃতি-প্রেমের উত্তরাধিকার বহন করবেন। ডরোথির মাধ্যমেই কবির চিন্তা ও দর্শন বেঁচে থাকবে। এটি কেবল ভাই-বোনের সম্পর্ক নয়, বরং দুই আত্মার এক গভীর আধ্যাত্মিক মিলন।


'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: 'Preface' (প্রিফেস)

আমরা কবিতার বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক আলোচনা করলাম, তবে এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ হলো এর 'Preface' (১৮০০) বা ভূমিকা। এটিকে রোমান্টিক সাহিত্যের 'ইশতেহার' (Manifesto) বলা হয়। এখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতার একটি বিখ্যাত সংজ্ঞা দিয়েছিলেন:

"Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquillity." (কবিতা হলো শক্তিশালী আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ: যা নির্জনতায় স্মরণ করা আবেগ থেকে জন্ম নেয়।)

ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার সেই বিখ্যাত সংজ্ঞাটি— "Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquillity"—বোঝা মানেই রোমান্টিক সাহিত্যের মূল দর্শনটি বুঝে ফেলা।

চলুন, এই জটিল সংজ্ঞাটিকে চারটি সহজ ধাপে ভেঙে আলোচনা করি:


১. শক্তিশালী আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ (Spontaneous Overflow)

ওয়ার্ডসওয়ার্থ বিশ্বাস করতেন, কবিতা কোনো জোর করে লেখা জিনিস নয়। যখন কোনো কবির মন কোনো গভীর অনুভূতি বা আবেগে (যেমন: প্রচণ্ড আনন্দ বা গভীর দুঃখ) কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সেই আবেগ আপনাআপনি শব্দের আকারে বেরিয়ে আসে। একেই তিনি বলেছেন 'Spontaneous Overflow'। এটি অনেকটা ঝরনার জল উপচে পড়ার মতো।

২. নির্জনতায় স্মরণ করা (Recollected in Tranquillity)

এখানেই ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিশেষত্ব। তিনি বলছেন, আবেগ যখন প্রচণ্ড তীব্র থাকে (অর্থাৎ ঘটনার ঠিক সেই মুহূর্তে), তখন কবিতা লেখা সম্ভব নয়।

  • উদাহরণ: আপনি যখন প্রচণ্ড রেগে আছেন, তখন আপনি রাগের মাথায় কবিতা লিখতে পারবেন না।

  • প্রক্রিয়া: আপনাকে শান্তভাবে কোনো নির্জন জায়গায় বসতে হবে (Tranquillity)। তারপর সেই পুরনো আবেগ বা স্মৃতিটিকে মনে করতে হবে (Recollect)।

৩. আবেগের পুনর্জন্ম

যখন আপনি শান্ত মনে সেই স্মৃতিটি ভাববেন, তখন আপনার মনে সেই আগের আবেগটি আবার ফিরে আসবে। কিন্তু এবার সেই আবেগটি হবে পরিশ্রুত এবং শৈল্পিক। এই শান্ত মনের স্মৃতি থেকেই প্রকৃত কবিতার জন্ম হয়।


৪. 'The Solitary Reaper' (দ্য সলিটারি রিপার): এই সংজ্ঞার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ

এই কবিতাটি 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর মেজাজকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে। এখানে কবি পাহাড়ি অঞ্চলের একটি মেয়েকে একা শস্য কাটতে এবং গান গাইতে দেখেন:

  • ঘটনা: মেয়েটি একটি অজানা ভাষায় গান গাইছিল, যা কবির মনে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে। তিনি গানের অর্থ না বুঝলেও তার সুরের বিষণ্ণতায় মুগ্ধ হন।

  • সংজ্ঞার প্রয়োগ: কবি সেই মুহূর্তে কবিতাটি লেখেননি। তিনি যখন পাহাড় থেকে নেমে এলেন এবং অনেকদিন পর নির্জনতায় সেই গানটির কথা ভাবলেন, তখন তাঁর মনে সেই পুরনো আবেগ আবার জেগে উঠল। সেই স্মৃতি থেকেই জন্ম নিল এই কবিতা।

  • বিখ্যাত লাইন: > "The music in my heart I bore, / Long after it was heard no more." (অর্থাৎ, গানটি থেমে যাওয়ার অনেক পরেও সেই সুর আমি আমার হৃদয়ে বয়ে নিয়ে চলেছি।)

ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার সংজ্ঞাটি আলোচনার পর এখন 'লুসি কবিতা গুচ্ছ' (Lucy Poems) নিয়ে আলোচনা করা যাক। এটি 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর একটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং রহস্যময় অংশ।

১৭৯৮ থেকে ১৮০১ সালের মধ্যে জার্মানিতে থাকাকালীন ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঁচটি কবিতার একটি সিরিজ লেখেন, যা 'লুসি পোয়েমস' নামে পরিচিত। এই কবিতাগুলোতে এক অজ্ঞাতপরিচয় তরুণী 'লুসি'-র প্রতি কবির গভীর প্রেম এবং তার অকাল মৃত্যুর শোক ফুটে উঠেছে।


১. লুসি আসলে কে? (The Mystery of Lucy)

লুসি কে ছিলেন, তা নিয়ে সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেক বিতর্ক আছে:

  • কেউ মনে করেন লুসি কবির কল্পনাপ্রসূত এক আদর্শ নারী।

  • কেউ মনে করেন তিনি কবির বোন ডরোথি বা তাঁর শৈশবের কোনো হারানো প্রেম।

  • তবে অধিকাংশের মতে, লুসি হলো 'প্রকৃতির মানসকন্যা'। সে ছিল প্রকৃতির মতোই শুদ্ধ এবং নিভৃতচারী।


২. প্রধান বৈশিষ্ট্য ও দর্শন

লুসি কবিতাগুলোতে ওয়ার্ডসওয়ার্থের রোমান্টিক দর্শনের তিনটি প্রধান দিক ফুটে ওঠে:

ক. নির্জনতা ও সারল্য (Solitude and Simplicity)

লুসি কোনো জনাকীর্ণ শহরে নয়, বরং প্রকৃতির নিভৃত কোণে বাস করত। যেমন একটি বিখ্যাত কবিতায় (She Dwelt Among the Untrodden Ways) কবি বলছেন:

"A violet by a mossy stone / Half hidden from the eye!" (শেওলা ধরা পাথরের পাশে ফুটে থাকা একটি বেগুনী ফুল, যা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে।)

খ. প্রকৃতির সাথে বিলীন হওয়া

লুসি যখন মারা যায়, কবি শোকাতুর হলেও একটি গভীর সত্য অনুভব করেন। তাঁর কাছে মৃত্যু মানে প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া। 'A Slumber Did My Spirit Seal' কবিতায় তিনি লিখেছেন:

"Rolled round in earth's diurnal course, / With rocks, and stones, and trees." (সে এখন পৃথিবীর আহ্নিক গতির সাথে মিশে গিয়ে পাথর আর গাছের মতোই প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছে।)

গ. শোকের গাম্ভীর্য

এই কবিতাগুলোতে কোনো চিৎকার বা হাহাকার নেই। শোক এখানে অত্যন্ত শান্ত এবং গভীর। প্রিয়তমার মৃত্যু কবির কাছে মহাজাগতিক এক স্তব্ধতা নিয়ে আসে।


৩. লুসি সিরিজের ৫টি প্রধান কবিতা

১. Strange fits of passion have I known ২. She dwelt among the untrodden ways ৩. I travelled among unknown men ৪. Three years she grew in sun and shower ৫. A slumber did my spirit seal


Read More (Index-)

1. ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস  

2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস 

3.  অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস

4.  মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ

5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০১০৬৬)

6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬১৫০০

7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)  

8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur   

9. William Langland: Piers Plowman 

10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০১৬৬০

11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet  

12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus   

13.Edmund Spenser: The Faerie Queene     

14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)

15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০১৭৯৮

16. John Dryden: Absalom and Achitophel   

17. Alexander Pope: The Rape of the Lock 

18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)   

19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe  

20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮১৮৩২) : আবেগপ্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য 

21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads  :  বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২১৯০১শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন

26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;

27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু 

28. Robert Browning: My Last Duchess  বিষয়বস্তু

29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles   বিষয়বস্তু 

30. আধুনিক যুগ (১৯০১১৯৩৯প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ 

31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড)  বিষয়বস্তু 

32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু  

33. James Joyce: Ulysses  :বিষয়বস্তু 

34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু 

35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯বর্তমানদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা 

36. Samuel Beckett: Waiting for Godot: বিষয়বস্তু 

37. George Orwell: 1984, Animal Farm: বিষয়বস্তু  

৪. 'লিরিক্যাল ব্যালাডস'-এর তাৎপর্য (উপসংহার)

সামগ্রিকভাবে দেখলে, 'লিরিক্যাল ব্যালাডস' সাহিত্যকে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের কুঁড়েঘরে এবং প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রান্তরে বসিয়েছিল। এটি আমাদের শিখিয়েছে যে—

  • বড় কবিতা লেখার জন্য বড় কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, একটি সাধারণ মেয়ের গান বা একটি পাখির মৃত্যুই যথেষ্ট।

  • মানুষের মন এবং প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর সংযোগ রয়েছে।

পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com

Post a Comment

0 Comments