ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন ঘটেছিল এই সময়ের সাহিত্যে : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

 

ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন ঘটেছিল এই সময়ের সাহিত্যে : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক মহাবিপ্লবের সময়। একদিকে বিজ্ঞানের জয়জয়কার এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চরম বিস্তার, অন্যদিকে দারিদ্র্য আর নৈতিক দ্বন্দ্ব—এই বৈপরীত্যই ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে।

আপনার আলোচনার সুবিধার্থে বিষয়টিকে কয়েকটি মূল স্তম্ভে ভাগ করে উপস্থাপন করছি:


১. ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু

ভিক্টোরিয়ান সাহিত্য কেবল কল্পনানির্ভর ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন সমাজের একটি জীবন্ত দলিল।

  • শিল্প বিপ্লব ও নগরায়ণ: বাষ্পীয় ইঞ্জিন আর কারখানার প্রভাবে গ্রামীণ ইংল্যান্ড বদলে গিয়ে ঘিঞ্জি শহরে পরিণত হয়। সাহিত্যের পাতায় ফুটে ওঠে সেই যান্ত্রিক জীবন এবং শ্রমিক শ্রেণির মানবেতর জীবনযাত্রা।

  • ধর্ম বনাম বিজ্ঞান: ১৮৫৯ সালে ডারউইনের The Origin of Species প্রকাশের পর মানুষের চিরাচরিত ধর্মীয় বিশ্বাসে চির ধরে। সাহিত্যে 'Faith' (বিশ্বাস) এবং 'Doubt' (সংশয়) এর মধ্যকার লড়াই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

  • সামাজিক সংস্কার ও নারীবাদ: চার্লস ডিকেন্সের মতো লেখকরা অনাথ আশ্রমের অমানবিকতা বা আইনি ব্যবস্থার জটিলতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি শার্লট ব্রন্টি বা জর্জ এলিয়টের লেখায় নারীর অধিকার এবং সামাজিক অবস্থানের প্রশ্নগুলো জোরালো হয়ে ওঠে।


২. পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

পাশ্চাত্য বা ইউরোপীয় সাহিত্যে এই যুগটি 'বাস্তববাদ' (Realism) এবং 'প্রকৃতিবাদ' (Naturalism) এর ভিত গড়ে দিয়েছিল।

  • উপন্যাসের স্বর্ণযুগ: এই সময়েই উপন্যাস সাহিত্যের প্রধান শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডিকেন্স, থ্যাকারে, টমাস হার্ডি এবং জেন অস্টেনের (যিনি যুগের সন্ধিক্ষণে ছিলেন) কাজগুলো ইউরোপীয় সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

  • নৈতিক আদর্শবাদ: সাহিত্যে একটি শক্তিশালী নৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা ফরাসি বা রুশ সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছিল।


৩. প্রাচ্য সাহিত্যে (বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে) প্রভাব

ভিক্টোরিয়ান যুগের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নবজাগরণে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকায় ইংরেজি সাহিত্যের এই ধারাগুলো বাঙালি লেখকদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।

  • সামাজিক সচেতনতা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে আমরা যে সামাজিক সংস্কারের সুর পাই, তার মূলে ছিল ভিক্টোরিয়ান বাস্তববাদ।

  • মহাকাব্য ও কবিতা: মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যচর্চায় পাশ্চাত্য রীতির ছোঁয়া থাকলেও, ভিক্টোরিয়ান কবি লর্ড টেনিসন বা রবার্ট ব্রাউনিংয়ের গাম্ভীর্য ও ছন্দশৈলী তৎকালীন বাংলার অনেক কবিকে প্রভাবিত করেছিল।

  • নারীর জাগরণ: রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখায় যে অধিকার সচেতনতা দেখা যায়, তার সাথে ভিক্টোরিয়ান যুগের নারী আন্দোলনের বৈশ্বিক প্রভাবের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।


সংক্ষেপে তুলনামূলক চিত্র

বৈশিষ্ট্য

পাশ্চাত্য সাহিত্য (ভিক্টোরিয়ান)

প্রাচ্য/বাংলা সাহিত্য (তৎকালীন)

মূল সুর

শিল্পায়ন ও সাম্রাজ্যবাদ

ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আত্মপরিচয় খোঁজা

প্রধান মাধ্যম

সামাজিক উপন্যাস ও নাটক

উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গীতিকবিতা

দৃষ্টিভঙ্গি

বিজ্ঞানের প্রভাবে সংশয়বাদ

ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সমাজ সংস্কার

ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের দুই মহারথী—চার্লস ডিকেন্স এবং টমাস হার্ডি—একই যুগের হলেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আকাশ-পাতাল তফাৎ। ডিকেন্স যেখানে লন্ডনের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন গলি আর মানবিকতার গল্প শুনিয়েছেন, হার্ডি সেখানে দেখিয়েছেন প্রকৃতির রূঢ়তা আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।

চলুন এই দুই লেখকের জগত এবং ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের বিশেষ একটি ধারা সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নিই:


১. চার্লস ডিকেন্স: নগরায়ণ ও শৈশবের রূপকার

ডিকেন্স ছিলেন ভিক্টোরিয়ান যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ। তিনি শিল্প বিপ্লবের অন্ধকার দিকগুলো (যেমন: শিশুশ্রম, দারিদ্র্য এবং ত্রুটিপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা) অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

  • বিখ্যাত কাজ: Oliver Twist, Great Expectations, A Tale of Two Cities।

  • দর্শন: তার লেখায় সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ থাকলেও শেষ পর্যন্ত এক ধরণের 'মানবিক আশাবাদ' কাজ করত। তিনি বিশ্বাস করতেন ব্যক্তিগত দয়া দিয়ে সমাজ বদলানো সম্ভব।


২. টমাস হার্ডি: ট্র্যাজেডি ও প্রকৃতির রূঢ়তা

ডিকেন্স যখন লন্ডন নিয়ে ব্যস্ত, হার্ডি তখন লিখেছিলেন ইংল্যান্ডের কাল্পনিক গ্রামীণ অঞ্চল 'ওয়েসেক্স' (Wessex) নিয়ে। তার সাহিত্য ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের শেষের দিকের 'নিরাশাবাদ' বা Pessimism-এর প্রতিফলন।

  • বিখ্যাত কাজ: Tess of the d'Urbervilles, The Mayor of Casterbridge, Jude the Obscure।

  • দর্শন: হার্ডি বিশ্বাস করতেন মানুষ তার ভাগ্যের হাতে এক অসহায় পুতুল। তার উপন্যাসে আধুনিকতা যখন শান্ত গ্রাম্য জীবনে আঘাত হানে, তখন ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।


৩. একটি বিশেষ ধারা: 'ভিক্টোরিয়ান আপোষ' (Victorian Compromise)

এটি কোনো উপন্যাসের নাম নয়, বরং সে সময়ের একটি মানসিকতা। সাহিত্যে এটি ছিল বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে, অথবা চরম বিলাসিতা ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা।

  • বৈশিষ্ট্য: একদিকে ব্রিটিশরা তাদের প্রগতি নিয়ে গর্ব করত, অন্যদিকে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় দেখে শঙ্কিত হতো। এই দ্বিধা বা 'Compromise' টেনিসনের কবিতা থেকে শুরু করে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ড্রামাটিক মনোলোগ পর্যন্ত সবখানে ছড়িয়ে আছে।


ডিকেন্স বনাম হার্ডি: এক নজরে

বৈশিষ্ট্য

চার্লস ডিকেন্স

টমাস হার্ডি

প্রেক্ষাপট

প্রধানত শহর (লন্ডন)

প্রধানত গ্রাম (ওয়েসেক্স)

দৃষ্টিভঙ্গি

সংস্কারবাদী ও আশাবাদী

ট্র্যাজিক ও নিয়তিবাদী

কেন্দ্রীয় চরিত্র

সাধারণত অনাথ শিশু বা সাধারণ মানুষ

সামাজিক নিয়মের বলি হওয়া চরিত্র

চমৎকার প্রস্তাব! ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্য পূর্ণতা পায় না যদি না আমরা সেই সময়ের নারী লেখকদের বৈপ্লবিক অবদানের কথা বলি। বিশেষ করে ব্রন্টি ভগ্নিদ্বয় (Brontë Sisters) এবং জর্জ এলিয়ট যেভাবে তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং সাহিত্যের প্রথাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন, তা এক কথায় অতুলনীয়।

চলুন, তাদের অবদান এবং বিশেষ করে শার্লট ব্রন্টির 'জেন আয়ার' বা জর্জ এলিয়টের 'মিডলমার্চ'-এর প্রেক্ষাপটে কিছু মূল বিষয় দেখে নিই:


১. ব্রন্টি ভগ্নিদ্বয় (শার্লট, এমিলি এবং অ্যান)

এই তিন বোন নির্জন হাওয়ার্থ (Haworth) গ্রামে বাস করলেও তাদের কল্পনাশক্তি ছিল আগ্নেয়গিরির মতো শক্তিশালী। তৎকালীন সময়ে নারীদের লেখালিখি অতটা সহজ ছিল না বলে তারা প্রথমে 'কারার, এলিস এবং অ্যাক্টন বেল' (Currer, Ellis, and Acton Bell) ছদ্মনামে লিখতেন।

  • শার্লট ব্রন্টি (Jane Eyre): 'জেন আয়ার' উপন্যাসে তিনি একজন অনাথ মেয়ের স্বাধীনচেতা মনোভাব আর আত্মসম্মানবোধ ফুটিয়ে তোলেন। এটি ছিল তৎকালীন যুগের জন্য অত্যন্ত সাহসী এক পদক্ষেপ।

  • এমিলি ব্রন্টি (Wuthering Heights): এটি ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং শক্তিশালী উপন্যাস। প্রেম, ঘৃণা এবং প্রতিশোধের এমন তীব্র রূপ ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্য কোনো লেখায় মেলা ভার।

  • অ্যান ব্রন্টি (The Tenant of Wildfell Hall): তিনি পারিবারিক সহিংসতা এবং মদ্যপানের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, যা সেই সময়ে ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক।


২. জর্জ এলিয়ট (ম্যারিয়ান ইভান্স)

'জর্জ এলিয়ট' আসলে ম্যারিয়ান ইভান্স-এর ছদ্মনাম। তিনি চেয়েছিলেন তার লেখাকে যেন সমাজ কেবল 'মেয়েলি সস্তা রোমান্স' হিসেবে না দেখে গুরুত্বের সাথে বিচার করে।

  • বিখ্যাত কাজ: Middlemarch, The Mill on the Floss, Silas Marner।

  • অবদান: এলিয়ট ছিলেন 'মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ'-এর পথপ্রদর্শক। তার বিখ্যাত উপন্যাস 'মিডলমার্চ'-কে বলা হয় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত তাদের জীবন ও সমাজকে প্রভাবিত করে।


৩. ভিক্টোরিয়ান নারী সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য

নারী লেখকরা সেই সময়কার সাহিত্যের গতানুগতিক ধারা বদলে দিয়েছিলেন:

  1. অভ্যন্তরীণ জগত (Internal World): তারা বাইরের জগতের চেয়ে মানুষের মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আবেগকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

  2. সামাজিক সীমাবদ্ধতা: উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সমাজের কঠোর নিয়মকানুনের ভেতরে নারীর দমবন্ধ হওয়া পরিস্থিতি তারা ফুটিয়ে তুলতেন।

  3. শিক্ষা ও অধিকার: জেন আয়ারের মতো চরিত্ররা শিক্ষার মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন দেখাত, তা তৎকালীন নারী জাগরণে বড় ভূমিকা রেখেছিল।


কেন তারা আজও প্রাসঙ্গিক?

আজকের আধুনিক যুগেও যখন আমরা নারী অধিকার বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলি, তখন ব্রন্টি বোনদের বা জর্জ এলিয়টের লেখাগুলো আমাদের পথ দেখায়। তারা শিখিয়েছিলেন যে কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হলেও কলমের মাধ্যমে বিপ্লব সম্ভব।

চমৎকার! আপনি যখন জানতে চেয়েছেন, তখন শার্লট ব্রন্টির 'জেন আয়ার' (Jane Eyre) এবং জর্জ এলিয়টের বাস্তববাদী দর্শন—উভয় দিকই সংক্ষেপে কিন্তু গভীরভাবে দেখে নেওয়া যাক। কারণ একটি আমাদের শেখায় ব্যক্তিগত বিদ্রোহ, আর অন্যটি শেখায় সামাজিক বাস্তবতা।


১. 'জেন আয়ার': আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার ইশতেহার

শার্লট ব্রন্টির এই উপন্যাসটি ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের এক বৈপ্লবিক সৃষ্টি। জেন কোনো প্রথাগত সুন্দরী বা ধনী নায়িকা ছিল না, সে ছিল কুৎসিত সমাজের চোখে এক 'সাধারণ' অনাথ মেয়ে, যার অস্ত্র ছিল তার ব্যক্তিত্ব।

জেন আয়ার-এর সেই বিখ্যাত স্বাধীনচেতা সংলাপ:

উপন্যাসের এক পর্যায়ে যখন মিস্টার রচেস্টার জেনকে তুচ্ছ ভেবে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তখন জেন গর্জে উঠে বলেছিলেন:

"Do you think, because I am poor, obscure, plain, and little, I am soulless and heartless? You think wrong! — I have as much soul as you, — and full as much heart!"

(আপনি কি মনে করেন আমি গরিব, অখ্যাত, সাধারণ এবং ক্ষুদ্র বলে আমার আত্মা বা হৃদয় নেই? আপনি ভুল ভাবছেন! আপনার যতটুকু আত্মা আর হৃদয় আছে, আমারও ঠিক ততটুকুই আছে!)

গল্পের সারসংক্ষেপ: এক অনাথ বালিকা জেন, যে তার নিষ্ঠুর আত্মীয়দের বাড়ি এবং কঠোর বোর্ডিং স্কুল 'লোউড' (Lowood)-এ বড় হয়। পরে সে 'থর্নফিল্ড হল'-এ গভর্নেস হিসেবে যোগ দেয় এবং মালিক মিস্টার রচেস্টারের প্রেমে পড়ে। কিন্তু বিয়ের মুহূর্তে সে জানতে পারে রচেস্টারের আগের স্ত্রী (বার্থা মেসন) পাগল অবস্থায় চিলেকোঠায় বন্দী। নিজের নৈতিকতা আর আত্মসম্মান রক্ষার্থে জেন সেই বিলাসিতা ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ে। শেষে অনেক সংগ্রামের পর সে স্বাধীন এবং স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসে।


২. জর্জ এলিয়টের বাস্তববাদী দর্শন (Realistic Philosophy)

জর্জ এলিয়ট (ম্যারিয়ান ইভান্স) বিশ্বাস করতেন সাহিত্য কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা (Sympathy) জাগানোর মাধ্যম।

  • সাধারণ মানুষের মহাকাব্য: এলিয়ট রাজা-রানীর গল্পের বদলে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সুখ-দুঃখকে গুরুত্ব দিতেন। তার মতে, আমাদের চারপাশের সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ আত্মত্যাগই পৃথিবীকে টিকিয়ে রেখেছে।

  • কার্যকরণ সম্পর্ক (Cause and Effect): তার দর্শনের মূল কথা ছিল—আমাদের প্রতিটি ছোট কাজ বা সিদ্ধান্তের একটি সুদূরপ্রসারী ফল থাকে। এটাকে তিনি 'Moral Responsibility' বা নৈতিক দায়বদ্ধতা বলতেন।

  • মিডলমার্চ (Middlemarch): এই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি ছোট শহরের মানুষের জীবন একে অপরের সাথে জড়িয়ে থাকে এবং কীভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামাজিক বাস্তবতার চাপে পিষ্ট হয়।


জেন আয়ার বনাম জর্জ এলিয়ট: একটি তুলনা

বৈশিষ্ট্য

জেন আয়ার (শার্লট ব্রন্টি)

জর্জ এলিয়টের দর্শন

মূল ফোকাস

একক ব্যক্তির আবেগ ও স্বাধীনতা।

পুরো সমাজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো।

চরিত্রের ধরন

বিদ্রোহী এবং আবেগপ্রবণ।

চিন্তাশীল এবং বাস্তববাদী।

মূল বার্তা

নিজের অধিকার আদায়ে আপোষহীন হওয়া।

অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং কর্মফল বোঝা।

অবশ্যই! বার্থা মেসন চরিত্রটি ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় এবং বিতর্কিত চরিত্র। শার্লট ব্রন্টির 'জেন আয়ার' উপন্যাসে তাকে দেখা যায় মিস্টার রচেস্টারের প্রথমা স্ত্রী হিসেবে, যাকে তিনি 'পাগল' বলে থর্নফিল্ড হলের চিলেকোঠায় (Attic) বন্দী করে রেখেছিলেন।

কিন্তু আধুনিক নারীবাদী সমালোচকরা এই চরিত্রটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখেন। চলুন দেখি কেন এই চরিত্রটি এত গুরুত্বপূর্ণ:


১. বার্থা মেসন: ভিক্টোরিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি

উপন্যাসে বার্থাকে বর্ণনা করা হয়েছে একজন হিংস্র, দানবীয় এবং উন্মাদ নারী হিসেবে। তিনি জেনের বিয়ের ঘোমটা ছিঁড়ে ফেলেন এবং শেষে থর্নফিল্ড হলে আগুন লাগিয়ে দেন। সেই সময়ের পাঠকদের কাছে বার্থা ছিল কেবলই এক 'বিপজ্জনক বাধা', যা জেন ও রচেস্টারের মিলনের পথে অন্তরায়।

২. আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: "The Madwoman in the Attic"

১৯৭৯ সালে সান্দ্রা গিলবার্ট এবং সুসান গুবার তাদের বিখ্যাত বই The Madwoman in the Attic-এ বার্থা মেসনকে নিয়ে এক নতুন ব্যাখ্যা দেন। তাদের মতে:

  • দমিত সত্তা (Suppressed Self): বার্থা আসলে জেন আয়ারের নিজেরই ভেতরের দমিত রাগ এবং বিদ্রোহের প্রতীক। জেন তৎকালীন সমাজের কঠোর নিয়মে নিজেকে শান্ত রাখতে বাধ্য হতো, আর তার সেই অবদমিত ক্ষোভ যেন বার্থার উন্মাদনার মাধ্যমে প্রকাশ পেত।

  • পুরুষতান্ত্রিক বন্দিত্ব: বার্থার উন্মাদনা কি জন্মগত, নাকি তাকে বছরের পর বছর একাকী বন্দী করে রাখার ফলে তিনি উন্মাদ হয়েছেন? আধুনিক সমালোচকরা মনে করেন, বার্থা হলেন সেই সব নারীদের প্রতীক যাদের সমাজ তাদের কণ্ঠস্বর বা ইচ্ছার জন্য 'পাগল' আখ্যা দিয়ে ঘরের কোণে বন্দী করে রাখত।


৩. পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদী) দৃষ্টিভঙ্গি: Wide Sargasso Sea

বার্থা মেসনের জীবনের না বলা গল্প নিয়ে ১৯৬৬ সালে জঁ রাইস (Jean Rhys) একটি বিখ্যাত উপন্যাস লেখেন—'ওয়াইড সারগাসো সি'।

  • পরিচয়: এখানে দেখানো হয় বার্থার আসল নাম ছিল অ্যানটোনেট কসওয়ে। তিনি ছিলেন জ্যামাইকার একজন শ্বেতাঙ্গ নারী।

  • শোষণ: রচেস্টার কেবল টাকার লোভে তাকে বিয়ে করেন এবং ইংল্যান্ডে নিয়ে এসে তার পরিচয় কেড়ে নেন। সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা এবং স্বামীর অবহেলাই তাকে উন্মাদনার দিকে ঠেলে দেয়।

  • উপনিবেশবাদ: এখানে বার্থা হয়ে ওঠেন শোষিত উপনিবেশের (Colony) প্রতীক, আর রচেস্টার শোষক সাম্রাজ্যের।


কেন বার্থা মেসন আজও প্রাসঙ্গিক?

বিষয়

তাৎপর্য

মানসিক স্বাস্থ্য

বন্দিত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা কীভাবে মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে।

নারীর অধিকার

বিবাহিত জীবনে নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব।

সাহিত্যের বিনির্মাণ

একটি পার্শ্বচরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরো গল্পকে নতুনভাবে দেখা।


বার্থা মেসন চরিত্রটি আমাদের শেখায় যে, যাকে আমরা 'পাগল' বা 'ভয়ঙ্কর' বলে দূরে সরিয়ে রাখি, তার পেছনের বঞ্চনার গল্পটি শুনলে পুরো ইতিহাস বদলে যেতে পারে।

ভিক্টোরিয়ান সাহিত্যের অন্যতম শিহরণ জাগানো এবং মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র হলো মিস্টার হাইড। রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ১৮৮৬ সালের কালজয়ী উপন্যাস 'স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড' (Strange Case of Dr Jekyll and Mr Hyde)-এর মাধ্যমে এই চরিত্রটি বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে।

মিস্টার হাইড কেবল একজন ভিলেন নন, তিনি আসলে মানুষের অবদমিত আদিম প্রবৃত্তি এবং ভিক্টোরিয়ান সমাজের দ্বিমুখী আচরণের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।


১. মিস্টার হাইড কে? (চরিত্রের পটভূমি)

উপন্যাসে ডক্টর হেনরি জেকিল একজন অত্যন্ত সম্মানিত, ভদ্র এবং নীতিবান বিজ্ঞানী। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের ভেতরে দুটি সত্তা বাস করে—একটি ভালো, অন্যটি মন্দ। তিনি এমন একটি রাসায়নিক পানীয় তৈরি করেন যা পান করলে তার ভেতরের সমস্ত 'মন্দ' বা 'পাপ' অংশটি আলাদা হয়ে একটি নতুন রূপ ধারণ করে। সেই রূপটিই হলো মিস্টার হাইড।

  • শারীরিক গঠন: হাইড দেখতে বেটে, কুৎসিত এবং তাকে দেখলে মানুষের মনে এক অদ্ভুত ঘৃণা বা ভয়ের উদ্রেক হয়। কারণ তিনি ছিলেন শুদ্ধ অশুভ শক্তির প্রতীক।

  • স্বভাব: তিনি দয়ামায়াহীন, হিংস্র এবং সমাজ-সংসারের কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেন না।


২. ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিফলন: 'দ্বৈত সত্তা' (Double Life)

মিস্টার হাইড চরিত্রটি ভিক্টোরিয়ান সমাজের একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে:

  • সামাজিক মুখোশ: ভিক্টোরিয়ান যুগে মানুষকে বাইরে অত্যন্ত ভদ্র, ধার্মিক এবং নৈতিক হতে হতো। কিন্তু পর্দার আড়ালে অনেকেরই ছিল অন্ধকার জীবন। ডক্টর জেকিল হলেন সেই 'ভদ্রলোক' আর মিস্টার হাইড হলেন তার সেই 'গোপন অন্ধকার'।

  • বিজ্ঞান বনাম নৈতিকতা: ডক্টর জেকিল বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন, যার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। এটি সেই সময়ের বিজ্ঞান নিয়ে মানুষের ভয়ের বহিঃপ্রকাশ।

  • ডারউইনের প্রভাব: হাইডের বর্ণনা অনেকটা বানর বা আদিম মানুষের মতো। এটি ডারউইনের বিবর্তনবাদের সেই ভয়কে ফুটিয়ে তোলে—যে মানুষ সভ্য হলেও তার ভেতরে এখনও পশুবৃত্তীয় আদিমতা রয়ে গেছে।


৩. ডক্টর জেকিল বনাম মিস্টার হাইড: একটি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

বৈশিষ্ট্য

ডক্টর জেকিল (Dr. Jekyll)

মিস্টার হাইড (Mr. Hyde)

সামাজিক অবস্থান

সম্মানিত ডাক্তার ও বিজ্ঞানী।

সমাজের চোখে একজন অপরাধী।

চরিত্র

পরোপকারী, সংযত ও দয়ালু।

নিষ্ঠুর, আবেগপ্রবণ ও স্বার্থপর।

প্রতীকী অর্থ

সুপার-ইগো (Super-ego) বা বিবেক।

ইড (Id) বা আদিম প্রবৃত্তি।


৪. আধুনিক সাহিত্যে প্রভাব

মিস্টার হাইড চরিত্রটি থেকেই আধুনিক সাহিত্যের 'অ্যান্টি-হিরো' বা 'স্প্লিট পার্সোনালিটি' (Split Personality) ধারণার ব্যাপক প্রসার ঘটে। আজকের পপ কালচারে আমরা যে 'হাল্ক' (Hulk) বা বিভিন্ন সুপারভিলেনের দ্বৈত রূপ দেখি, তার আদি উৎস কিন্তু এই মিস্টার হাইড।

একটি মজার তথ্য: ইংরেজি ভাষায় আজ 'Jekyll and Hyde' একটি প্রবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন কোনো মানুষের আচরণে হুট করে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়, তখন তাকে এই নামে ডাকা হয়।

১. শার্লক হোমস: যুক্তির আলো বনাম কুয়াশাচ্ছন্ন লন্ডন

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল যখন ১৮৮৭ সালে শার্লক হোমসকে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি আসলে বিজ্ঞানের জয়গান গাইছিলেন।

  • বিমূর্ত যুক্তি (Deductive Reasoning): হোমস ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, যা বিশ্বাস করত—যতই জটিল অপরাধ হোক না কেন, বিজ্ঞান আর যুক্তি দিয়ে তার সমাধান সম্ভব।

  • লন্ডনের কুয়াশা: হোমসের গল্পগুলোতে লন্ডনের সেই পীত বর্ণের ঘন কুয়াশা (Yellow Fog) কেবল আবহ নয়, বরং অপরাধের এক অন্ধকার চাদর হিসেবে কাজ করে।

  • বিখ্যাত কাজ: A Study in Scarlet, The Hound of the Baskervilles।


২. কাউন্ট ড্রাকুলা: আদিম ভয় ও ভিক্টোরিয়ান উদ্বেগ

১৮৯৭ সালে ব্রাম স্টোকারের 'ড্রাকুলা' প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের শেষ দিকের এক চরম গথিক আতঙ্ক।

  • বাইরের মানুষের ভয় (The Outsider): ড্রাকুলা ছিলেন পূর্ব ইউরোপের একজন ট্রান্সিলভ্যানিয়ান কাউন্ট। তিনি যখন লন্ডনে আসেন, তা ছিল আসলে ব্রিটিশদের মনে বহিরাগত বা বিদেশিদের নিয়ে যে ভয় কাজ করত, তার বহিঃপ্রকাশ।

  • রক্ত ও বংশগতি: ভিক্টোরিয়ানরা বংশমর্যাদা এবং রক্তের শুদ্ধতা নিয়ে খুব সচেতন ছিল। ড্রাকুলা মানুষের রক্ত চুষে নিয়ে সেই শুদ্ধতা নষ্ট করার এক প্রতীকী রূপ।

  • আধুনিকতা বনাম প্রাচীনত্ব: ড্রাকুলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভ্যান হেলসিং এবং তার দল টাইপরাইটার, টেলিগ্রাম আর রক্ত সঞ্চালনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অর্থাৎ, আধুনিক বিজ্ঞান বনাম প্রাচীন অশুভ শক্তির লড়াই।


৩. শার্লক বনাম ড্রাকুলা: ভিক্টোরিয়ান দ্বন্দ্ব

বৈশিষ্ট্য

শার্লক হোমস

কাউন্ট ড্রাকুলা

প্রতীক

আধুনিকতা, যুক্তি ও শৃঙ্খলা।

অন্ধকার অতীত, আদিম ভয় ও বিশৃঙ্খলা।

অস্ত্র

ম্যাগনিফাইং গ্লাস এবং পর্যবেক্ষণ।

অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও রূপান্তর।

সমাজের ভূমিকা

সমাজকে রক্ষা করা (Protector)।

সমাজকে গ্রাস করা (Invader)।


একটি মজার সংযোগ: 'ড্রাকুলা' কি ভিক্টোরিয়ান যৌনতার ভয়?

অনেক সমালোচক মনে করেন, ড্রাকুলা চরিত্রটি আসলে ভিক্টোরিয়ান যুগের দমিত যৌন আকাঙ্ক্ষার (Suppressed Sexuality) এক প্রতীক। ড্রাকুলার কামড়কে সেই সময়ের কঠোর সমাজে এক ধরণের নিষিদ্ধ মিলনের রূপক হিসেবে দেখা হয়।

ভিক্টোরিয়ান যুগের গথিক সাহিত্যের আলোচনায় অস্কার ওয়াইল্ডের 'দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে' (The Picture of Dorian Gray) এক অনন্য সংযোজন। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি সেই সময়ের নৈতিকতা আর সৌন্দর্যের সংজ্ঞাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল।

ডোরিয়ান গ্রে-র চরিত্রটি কেবল রহস্যময় নয়, এটি ভিক্টোরিয়ান যুগের 'হেডনিজম' (Hedonism) বা পরম সুখবাদের এক চরম নিদর্শন। চলুন এই অদ্ভুত চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করি:


১. ডোরিয়ান গ্রে: চিরযৌবনের অভিশাপ

গল্পের শুরুতে ডোরিয়ান ছিলেন একজন দেবতুল্য সুন্দর ও নিষ্পাপ তরুণ। শিল্পী বাসিল হলওয়ার্ড তার একটি অসাধারণ প্রতিকৃতি (Portrait) আঁকেন। ডোরিয়ান সেই ছবি দেখে হাহাকার করে ওঠেন যে—ছবিটি চিরকাল সুন্দর থাকবে, অথচ তাকে বার্ধক্যে কুৎসিত হতে হবে। তিনি প্রার্থনা করেন:

"আমি যদি চিরকাল তরুণ থাকতাম, আর এই ছবিটা যদি বুড়ো হতো! এর জন্য আমি আমার আত্মাকে পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারি!"

তার এই বিপজ্জনক প্রার্থনা সত্যি হয়ে যায়। ডোরিয়ান আর বুড়ো হন না, কোনো পাপ বা অপরাধের ছাপ তার চেহারায় পড়ে না। কিন্তু তার ঘরের কোণে ঢাকা থাকা সেই ছবিটা ধীরে ধীরে কুৎসিত, বীভৎস আর পৈশাচিক হতে শুরু করে—কারণ ডোরিয়ানের প্রতিটি পাপের দাগ ওই ক্যানভাসে গিয়ে পড়ে।


২. ভিক্টোরিয়ান দ্বৈত সত্তার চূড়ান্ত রূপ

আমরা আগে ডক্টর জেকিল আর মিস্টার হাইড নিয়ে কথা বলেছি। ডোরিয়ান গ্রে-র গল্পটিও একই থিমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবে এখানে পদ্ধতিটা ভিন্ন:

  • বাইরের চটক বনাম ভেতরের পচন: ডোরিয়ান দিনের বেলা লন্ডনের আভিজাত্যপূর্ণ সমাজে ঘুরে বেড়াতেন, অপেরা শুনতেন আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হতেন। কিন্তু রাতে তিনি লন্ডনের সবচেয়ে নোংরা আফিম আড্ডায় (Opium Dens) যেতেন এবং জঘন্য সব অপরাধে লিপ্ত হতেন।

  • ভিক্টোরিয়ান মুখোশ: সমাজ কেবল বাইরের সৌন্দর্য দেখেই ডোরিয়ানকে 'পবিত্র' ভাবত। এটি ভিক্টোরিয়ানদের সেই অন্ধবিশ্বাসের ওপর বড় আঘাত ছিল যে—সুন্দর দেখতে মানুষ মানেই সে ভালো মানুষ।


৩. অস্কার ওয়াইল্ডের দর্শন: 'Art for Art's Sake'

অস্কার ওয়াইল্ড বিশ্বাস করতেন শিল্পের কাজ উপদেশ দেওয়া নয়, বরং সৌন্দর্য সৃষ্টি করা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন যখন শিল্প (ছবিটি) মানুষের জীবনের দর্পণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে।


ডোরিয়ান গ্রে বনাম ড্রাকুলা ও হাইড: এক নজরে

চরিত্র

অশুভ শক্তির উৎস

পরিণাম

মিস্টার হাইড

রাসায়নিক পানীয় (বিজ্ঞান)।

আত্মহত্যা ও বিলুপ্তি।

কাউন্ট ড্রাকুলা

অতিপ্রাকৃত অভিশাপ।

বিনাশ ও মুক্তি।

ডোরিয়ান গ্রে

নিজের ইচ্ছা ও অহংকার।

নিজের পাপের মুখোমুখি হওয়া ও মৃত্যু।


উপন্যাসের শেষে ডোরিয়ান যখন সেই বীভৎস ছবিটাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন, তখন আসলে তিনি নিজের আত্মাকেই আঘাত করেন। পরদিন ভৃত্যরা দেখে ঘরে এক বৃদ্ধ, কুৎসিত মানুষের লাশ পড়ে আছে, আর দেয়ালে টাঙানো ছবিটি আবার আগের মতো সুন্দর ও উজ্জ্বল হয়ে গেছে।

'দ্য স্পেকলেড ব্যান্ড': একটি রোমহর্ষক রহস্য

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের নিজের মতে, এটিই ছিল তার লেখা সেরা রহস্য গল্পগুলোর একটি।

১. ঘটনার শুরু

এক ভোরে হেলেন স্টোনার নামে এক আতঙ্কিত তরুণী শার্লক হোমসের কাছে আসেন। তার দুই বছর আগে তার বোন জুলিয়া ঠিক বিয়ের আগে এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে মারা যান। জুলিয়ার শেষ কথা ছিল— "The Speckled Band!" (সেই ছিটছিটে ব্যান্ডটি!)। এখন হেলেনের বিয়ে ঠিক হয়েছে এবং তাকে সেই একই ঘরে ঘুমাতে বাধ্য করা হচ্ছে যেখানে জুলিয়া মারা গিয়েছিলেন।

২. ভিক্টোরিয়ান ভিলেন: ডক্টর রয়লট

এই গল্পের ভিলেন ডক্টর গ্রিমসবি রয়লট হলেন ভিক্টোরিয়ান সমাজের এক ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের প্রতীক। তিনি প্রচণ্ড রাগী, শক্তিশালী এবং ভারতে থাকাকালীন অনেক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক প্রাণীর সংগ্রহ করেছিলেন। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সৎ মেয়েদের বিয়ে আটকে তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া টাকা আত্মসাৎ করা।

৩. রহস্যের সমাধান (SPOILER ALERT!)

হোমস যখন সেই ঘরে রাত কাটান, তিনি লক্ষ্য করেন:

  • একটি ভেন্টিলেটর (ঘুলঘুলি) যা পাশের ঘরের (ডক্টর রয়লটের ঘর) সাথে যুক্ত।

  • একটি নকল ঘণ্টা বাজানোর দড়ি (Bell-rope) যা সরাসরি বিছানার ওপর নেমে এসেছে।

  • বিছানাটি মেঝের সাথে স্ক্রু দিয়ে আটকানো, যাতে সরানো না যায়।

হঠাৎ হোমস একটি শিস দেওয়ার শব্দ শোনেন এবং দড়ির ওপর দিয়ে কিছু একটা নেমে আসতে দেখেন। তিনি তৎক্ষণাৎ লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। পাশের ঘরে শোনা যায় এক বিকট চিৎকার। হোমস আর ওয়াটসন গিয়ে দেখেন, ডক্টর রয়লট নিজের চেয়ারে মৃত অবস্থায় বসে আছেন, আর তার মাথায় জড়ানো আছে সেই 'স্পেকলেড ব্যান্ড'—যা আসলে ছিল ভারতের এক অত্যন্ত বিষধর সাপ (Swamp Adder)! ডক্টর রয়লট সাপটিকে শিস দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন, কিন্তু হোমসের আঘাতে সেটি খেপে গিয়ে নিজের মালিককেই কামড়ে দেয়।


কেন এই গল্পটি গুরুত্বপূর্ণ?

১. সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব: ভিক্টোরিয়ানরা বিশ্বাস করত ভারত বা প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা যে কোনো কিছু (যেমন বিষধর সাপ বা ডক্টর রয়লটের মেজাজ) রহস্যময় এবং বিপজ্জনক। ২. পারিবারিক অত্যাচার: পর্দার আড়ালে সৎ পিতার লোভ আর অত্যাচারের এই চিত্রটি তৎকালীন অনেক পরিবারের গোপন অন্ধকার দিক তুলে ধরে। ৩. বিজ্ঞানের জয়: যখন সবাই ভাবছিল এটি কোনো ভূতুড়ে ব্যাপার, হোমস তখন পর্যবেক্ষণ আর যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করলেন যে অশুভ শক্তির পেছনেও একটি বৈজ্ঞানিক কারণ থাকে।


শার্লক হোমসের এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি কি আপনাকে মুগ্ধ করে? নাকি আপনি জানতে চান কীভাবে অস্কার ওয়াইল্ডের ব্যক্তিগত জীবন এই ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছিল? ডোরিয়ান গ্রে-র লেখককে কেন শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য দিতে হয়েছিল, সেই গল্পটি কিন্তু অনেক বেশি করুণ।

পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com

Read More (Index-)

1. ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস  

2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস 

3.  অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস

4.  মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ

5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০১০৬৬)

6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬১৫০০

7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)  

8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur   

9. William Langland: Piers Plowman 

10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০১৬৬০

11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet  

12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus   

13.Edmund Spenser: The Faerie Queene     

14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)

15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০১৭৯৮

16. John Dryden: Absalom and Achitophel   

17. Alexander Pope: The Rape of the Lock 

18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)   

19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe  

20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮১৮৩২) : আবেগপ্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য 

21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads  :  বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২১৯০১শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন

26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;

27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু 

28. Robert Browning: My Last Duchess  বিষয়বস্তু

29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles   বিষয়বস্তু 

30. আধুনিক যুগ (১৯০১১৯৩৯প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ 

31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড)  বিষয়বস্তু 

32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু  

33. James Joyce: Ulysses  :বিষয়বস্তু 

34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু 

35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯বর্তমানদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা 

36. Samuel Beckett: Waiting for Godot: বিষয়বস্তু 

37. George Orwell: 1984, Animal Farm: বিষয়বস্তু  


Post a Comment

0 Comments