নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)

 


নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)

ইংরেজি সাহিত্যে নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (Neo-classical Period) বা নব্য-ধ্রুপদী যুগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৬৬০ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সিংহাসনে আরোহণের (Restoration) মাধ্যমে এই যুগের শুরু হয় এবং ১৭৯৮ সালে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের 'Lyrical Ballads' প্রকাশের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে।

এই যুগের বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:


১. নামকরণ ও প্রেক্ষাপট

'Neo' শব্দের অর্থ 'নতুন' এবং 'Classical' বলতে গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের আদর্শকে বোঝায়। এই সময়ের লেখকরা হোমার, ভার্জিল, হোরাস এবং জুভেনালের মতো প্রাচীন লেখকদের লেখনশৈলী এবং নিয়মকানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল ধ্রুপদী নিয়ম মেনেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।

২. প্রধান তিনটি পর্যায়

নিও-ক্লাসিক্যাল যুগকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

পর্যায়

সময়কাল

প্রধান লেখক ও বৈশিষ্ট্য

দ্য রেস্টোরেশন পিরিয়ড

১৬৬০–১৭০০

জন ড্রাইডেন প্রধান লেখক। কমেডি অফ ম্যানার্স এবং ব্যঙ্গাত্মক কবিতার উদ্ভব ঘটে।

দি অগাস্টান এজ

১৭০০–১৭৪৫

আলেকজান্ডার পোপ এবং জোনাথন সুইফট প্রধান। একে 'এজ অফ পোপ'-ও বলা হয়।

দি এজ অফ সেনসিবিলিটি

১৭৪৫–১৭৯৮

স্যামুয়েল জনসন প্রধান ব্যক্তি। উপন্যাসের বিকাশ এবং রোমান্টিকতার পূর্বাভাস পাওয়া যায়।


৩. এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

  • যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি (Reason and Intellect): এই যুগে আবেগ বা কল্পনার চেয়ে যুক্তি এবং বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। লেখকরা মনে করতেন সাহিত্য হবে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয়।

  • নিয়মনিষ্ঠা (Adherence to Rules): প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যের ব্যাকরণ ও গঠন কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। বিশেষ করে কবিতায় 'Heroic Couplet' (দুই লাইনের অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দ) ছিল অপরিহার্য।

  • শহুরে জীবন (Urban Life): গ্রামের সাধারণ মানুষের চেয়ে লন্ডনের অভিজাত সমাজ, কফি হাউজ কালচার এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই যুগের সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু ছিল।

  • ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্য (Satire): সমাজ ও রাজনীতির ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরার জন্য ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ার ছিল প্রধান হাতিয়ার। ড্রাইডেনের 'Mac Flecknoe' বা পোপের 'The Rape of the Lock' এর সার্থক উদাহরণ।

  • উপন্যাসের জন্ম: এই যুগেই আধুনিক ইংরেজি উপন্যাসের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ড্যানিয়েল ডিফো, স্যামুয়েল রিচার্ডসন এবং হেনরি ফিল্ডিং এই ধারার পথিকৃৎ।


৪. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক ও কর্ম

  • জন ড্রাইডেন: Absalom and Achitophel

  • আলেকজান্ডার পোপ: The Rape of the Lock, An Essay on Criticism

  • জোনাথন সুইফট: Gulliver's Travels

  • স্যামুয়েল জনসন: A Dictionary of the English Language

  • ড্যানিয়েল ডিফো: Robinson Crusoe


নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের লেখকদের মধ্যে আলেকজান্ডার পোপ (Alexander Pope) এবং জোনাথন সুইফট (Jonathan Swift) সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁদের দুটি কালজয়ী সৃষ্টি নিয়ে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করছি, যা এই যুগের মূল চেতনা বুঝতে আপনাকে সাহায্য করবে:


১. আলেকজান্ডার পোপ ও 'The Rape of the Lock'

পোপ ছিলেন এই যুগের কাব্যিক শৃঙ্খলার প্রতীক। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো 'The Rape of the Lock'।

  • ধরন: এটি একটি Mock-Heroic Epic (ব্যঙ্গাত্মক মহাকাব্য)।

  • বিষয়বস্তু: একটি বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটি লেখা—যেখানে লর্ড পিটর নামের এক যুবক বেলিন্ডা নামের এক তরুণীর একগুচ্ছ চুল (lock) কেটে নিয়েছিলেন। এই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে যে বিবাদ সৃষ্টি হয়, পোপ তা মহাকাব্যের স্টাইলে বর্ণনা করেছেন।

  • উদ্দেশ্য: তৎকালীন লন্ডনের অভিজাত সমাজের অন্তঃসারশূন্যতা এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাতামাতিকে ব্যঙ্গ করা।

২. জোনাথন সুইফট ও 'Gulliver's Travels'

সুইফট ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ স্যাটায়ারিস্ট বা ব্যঙ্গকার। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ 'Gulliver's Travels' (১৭২৬)।

  • গল্পের আড়ালে সত্য: আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ভ্রমণকাহিনী বা ছোটদের রূপকথা মনে হলেও, এটি আসলে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজনীতি, রাজতন্ত্র এবং মানবজাতির স্বভাবের ওপর একটি কঠোর চপেটাঘাত।

  • বিভাগ: বইটির চারটি খণ্ডে গালিভার ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় যান (যেমন- লিলিপুট, ব্রবডিংনাগ)। লিলিপুটদের ক্ষুদ্রতা দিয়ে তিনি মানুষের সংকীর্ণ মনমানসিকতাকে এবং জায়ান্টদের দিয়ে মানুষের কদর্যতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।


নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের লেখকদের কিছু বিশেষ কৌশল:

এই লেখকরা প্রধানত দুটি জিনিস ব্যবহার করতেন:

  1. Wit (বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা): সরাসরি গালি না দিয়ে বুদ্ধির জোরে কাউকে ছোট করা।

  2. Heroic Couplet: পোপের কবিতার প্রতিটি দুই লাইন শেষে অন্ত্যমিল থাকতো, যা পড়ার সময় একটি ছন্দবদ্ধ আভিজাত্য তৈরি করে।

রেস্টোরেশন কমেডি (Restoration Comedy) ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল এবং বিতর্কিত একটি অধ্যায়। ১৬৬০ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস যখন ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ফিরে আসেন (Restoration), তখন দীর্ঘ ১৮ বছরের পিউরিটান শাসনের কঠোরতা ও থিয়েটারের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। রাজার সাথে ফ্রান্স থেকে ফিরে আসা নতুন রুচি ও আমোদ-প্রমোদের জোয়ারে এই বিশেষ ধারার নাটকের জন্ম হয়।

নিচে রেস্টোরেশন কমেডির মূল বৈশিষ্ট্য এবং উল্লেখযোগ্য দিকগুলো আলোচনা করা হলো:


১. মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

এই নাটকের মূল ভিত্তি ছিল 'Wit' বা তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক রসিকতা। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • কমেডি অফ ম্যানার্স (Comedy of Manners): রেস্টোরেশন কমেডিকে মূলত 'কমেডি অফ ম্যানার্স' বলা হয়। এটি তৎকালীন উচ্চবিত্ত ও অভিজাত সমাজের চালচলন, আচার-ব্যবহার, পরকীয়া প্রেম এবং তাদের ভণ্ডামিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতো।

  • তীক্ষ্ণ সংলাপ ও হিউমার: এই নাটকের চরিত্ররা অত্যন্ত চতুর এবং বাকপটু হতো। তাদের সংলাপে থাকতো শ্লেষ এবং দ্ব্যর্থবোধক রসিকতা।

  • নারীদের মঞ্চে আগমন: এই যুগের সবচেয়ে বড় বিপ্লব ছিল নাটকে নারী চরিত্রে নারীদের অভিনয়। এর আগে কিশোর ছেলেরা নারী চরিত্রে অভিনয় করত। নেল গুইন (Nell Gwyn) ছিলেন এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী।

  • যৌনতা ও অনৈতিকতা: এই নাটকগুলো ছিল বেশ সাহসী এবং মাঝেমধ্যে অশ্লীলতার কাছাকাছি। সে সময়ের অভিজাত সমাজের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এবং বিলাসিতাকে এখানে খুব স্বাভাবিকভাবে দেখানো হতো।


২. প্রধান থিম (Themes)

  • প্রেম ও ষড়যন্ত্র: প্রেম এখানে আবেগ নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা বা গেম হিসেবে উপস্থাপিত হতো।

  • শহর বনাম গ্রাম: লন্ডন শহরকে বুদ্ধিমত্তার প্রতীক এবং গ্রামকে গেঁয়ো বা বোকাদের জায়গা হিসেবে দেখানো হতো।

  • ফপ (The Fop): এই নাটকের একটি অতি পরিচিত চরিত্র হলো 'ফপ' (Fop)—যে নিজের পোশাক-আশাক এবং স্টাইল নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন কিন্তু আসলে একজন নির্বোধ।


৩. উল্লেখযোগ্য নাটক ও নাট্যকার

নাট্যকার

বিখ্যাত নাটক

বিশেষত্ব

উইলিয়াম কনগ্রিভ

The Way of the World

একে রেস্টোরেশন কমেডির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মানা হয়।

উইলিয়াম ওয়াইচারলি

The Country Wife

এটি অত্যন্ত সাহসী এবং ব্যঙ্গাত্মক একটি নাটক।

জর্জ ইথারেজ

The Man of Mode

এখানে 'ফপ' চরিত্রের সার্থক চিত্রায়ন দেখা যায়।

অ্যাফরা বেন

The Rover

তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম পেশাদার মহিলা নাট্যকার।


৪. পতন ও পরিবর্তন

অতিরিক্ত অশ্লীলতা এবং নৈতিকতাহীনতার কারণে ১৭০০ সালের দিকে এই ধারার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। ১৬৯৮ সালে জেরেমি কলিয়ার তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'A Short View of the Immorality and Profaneness of the English Stage'-এ এই নাট্যধারার তীব্র সমালোচনা করেন। এর ফলে পরবর্তীতে 'সেন্টিমেন্টাল কমেডি' (Sentimental Comedy)-র উদ্ভব ঘটে।


একটি মজার তথ্য: রাজা দ্বিতীয় চার্লস নিজে থিয়েটার খুব পছন্দ করতেন এবং প্রায়ই ব্যক্তিগতভাবে নাটক দেখতে যেতেন, যা এই যুগের নাট্যকারদের অনেক বেশি উৎসাহিত করেছিল।

উইলিয়াম কনগ্রিভ-এর 'The Way of the World' (১৭০০) নাটকটি রেস্টোরেশন কমেডির এক অনন্য নিদর্শন। এর কাহিনী বেশ জটিল, কারণ এতে অনেকগুলো চরিত্র এবং তাদের মধ্যকার গোপন সম্পর্কের জাল বোনা হয়েছে। তবে মূল লক্ষ্য ছিল—তৎকালীন সমাজের বিয়ে, সম্পত্তি এবং প্রেমের পেছনের স্বার্থপরতাকে তুলে ধরা।

নিচে কাহিনীটি সহজভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:


১. মূল পটভূমি: মিরাবেল ও মিলাম্যান্টের প্রেম

নাটকের নায়ক মিরাবেল (Mirabell) এবং নায়িকা মিলাম্যান্ট (Millamant) একে অপরকে ভালোবাসেন। মিলাম্যান্ট অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং স্বাধীনচেতা নারী। কিন্তু তাদের বিয়ের পথে বড় বাধা হলো টাকা। মিলাম্যান্টের অর্ধেক সম্পত্তি (৬,০০০ পাউন্ড) তার খালা লেডি উইশফোর্ট (Lady Wishfort)-এর নিয়ন্ত্রণে। যদি মিলাম্যান্ট খালার অমতে বিয়ে করে, তবে সে এই সম্পত্তি হারাবে।

২. মিরাবেলের চতুর পরিকল্পনা

লেডি উইশফোর্ট মিরাবেলকে দুচোখে দেখতে পারেন না। তাই মিরাবেল একটি বুদ্ধি বের করে: সে তার চাকর ওয়েটওয়েল (Waitwell)-কে ছদ্মবেশে 'স্যার রোল্যান্ড' সাজিয়ে লেডি উইশফোর্টের কাছে পাঠায়। পরিকল্পনা ছিল—লেডি উইশফোর্ট যদি ছদ্মবেশী স্যার রোল্যান্ডের প্রেমে পড়েন এবং তাকে বিয়ে করতে রাজি হন, তবে মিরাবেল সেই গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মিলাম্যান্টের সম্পত্তির অনুমতি আদায় করে নেবে।

৩. খলনায়ক ও ষড়যন্ত্র (Fainall & Mrs. Marwood)

এই নাটকের মূল ভিলেন হলো ফেনল (Fainall) এবং তার প্রেমিকা মিসেস মারউড (Mrs. Marwood)। ফেনল আসলে লেডি উইশফোর্টের মেয়ের জামাই, কিন্তু সে অত্যন্ত লোভী। সে চায় লেডি উইশফোর্টের সমস্ত সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে। মিসেস মারউড মিরাবেলের পরিকল্পনাটি জেনে ফেলেন এবং লেডি উইশফোর্টকে সব বলে দেন। ফলে মিরাবেলের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

৪. ক্লাইম্যাক্স ও সমাধান

ফেনল তখন লেডি উইশফোর্টকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করে। সে দাবি করে, যদি সম্পত্তি তাকে না দেওয়া হয়, তবে সে লেডি উইশফোর্টের মেয়ের (Mrs. Fainall) চারিত্রিক কলঙ্ক রাষ্ট্র করে দেবে। লেডি উইশফোর্ট নিরুপায় হয়ে পড়েন।

ঠিক এই সময়ে মিরাবেল একটি ট্রাম্প কার্ড খেলেন। তিনি একটি পুরনো আইনি দলিল (Deed of Trust) হাজির করেন, যেখানে দেখা যায় মিসেস ফেনল তাঁর বিয়ের আগেই তাঁর সমস্ত সম্পত্তি মিরাবেলের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। ফলে ফেনলের ব্ল্যাকমেইল আর কাজে আসে না। কৃতজ্ঞতায় লেডি উইশফোর্ট মিরাবেল ও মিলাম্যান্টের বিয়েতে রাজি হন এবং তাদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন।


৫. কেন এটি বিখ্যাত? (Proviso Scene)

এই নাটকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ হলো 'The Proviso Scene'। এখানে বিয়ের আগে মিরাবেল ও মিলাম্যান্ট একে অপরের ওপর কিছু শর্ত আরোপ করেন। যেমন—বিয়ের পর কেউ কাউকে 'মাই ডিয়ার' বলে আদিখ্যেতা করবে না, একে অপরের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না ইত্যাদি। এটি দেখায় যে, সেই আমলেও নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


নাটকের মূল শিক্ষা (The Way of the World)

নাটকটির নাম 'The Way of the World' বা 'দুনিয়ার রীতি' রাখার কারণ হলো—এখানে দেখানো হয়েছে যে দুনিয়াটা এভাবেই চলে; যেখানে ভালোবাসা থাকলেও টাকা, সম্পত্তি এবং চতুরতা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন।

নিশ্চয়ই! মিসেস মিলাম্যান্ট (Mrs. Millamant) চরিত্রটি কেন নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের বা রেস্টোরেশন কমেডির ইতিহাসে এত বিখ্যাত, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি কেবল একজন সুন্দরী নায়িকা নন, বরং আধুনিক নারী চেতনার এক আগাম বার্তা।

নিচে মিলাম্যান্ট চরিত্রের প্রধান দিকগুলো আলোচনা করা হলো:


১. বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা (Intellectual Independence)

মিলাম্যান্ট অত্যন্ত বিদুষী এবং বাকপটু। সে সময়ের অন্য দশজন নারীর মতো তিনি কেবল পুরুষের মনোযোগ পাওয়ার জন্য সাজগোজ করতেন না। তিনি স্পষ্ট বলতেন, "I nauseate walking; 'tis a country diversion, I loathe the country." অর্থাৎ, তিনি গ্রামীণ জীবন বা গতানুগতিক নারীসুলভ আচরণ পছন্দ করতেন না। তাঁর কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বা 'Wit' ছিল প্রধান অস্ত্র।

২. বিয়ের আগের শর্তাবলী (The Proviso Scene)

নাটকের চতুর্থ অঙ্কে মিরাবেলের সাথে তাঁর যে কথোপকথন হয়, তা ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি বিয়ের আগে মিরাবেলের ওপর কিছু শর্ত দেন, যেমন:

  • বিয়ের পর তাঁকে কেউ 'স্ত্রী' বা 'গিন্নি' বলে সম্বোধন করে তাঁর ব্যক্তিগত সত্তাকে ছোট করতে পারবে না।

  • তিনি যখন খুশি চা খাবেন বা চিঠি লিখবেন, তাতে স্বামী হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

  • তিনি তাঁর পছন্দমতো পোশাক পরবেন এবং সামাজিক মেলামেশা করবেন।

তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন— "I'll be as strange as if we had been married a great while; and as well-bred as if we were not married at all." (আমরা এমন আচরণ করব যেন দীর্ঘদিনের বিবাহিত, আবার এমন ভদ্রতা বজায় রাখব যেন আমরা বিবাহিতই নই।)

৩. বিয়ের ভয় ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য

মিলাম্যান্ট বিয়ে করতে ভয় পেতেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল বিয়ের পর নারী তাঁর স্বাধীনতা হারিয়ে স্বামীর ছায়ায় পরিণত হয়। তিনি তাঁর কুমারীত্ব বা একক অস্তিত্ব হারানোর ভয়কে বর্ণনা করেছেন এভাবে— "My dear liberty, shall I leave thee? My faithful solitude, my golden, undisturbed retirement, shall I quit you for a man?" এই উক্তিটি প্রমাণ করে তিনি তাঁর স্বাধীনতাকে কতটা মূল্য দিতেন।

৪. সৌন্দর্য ও আভিজাত্য

মিলাম্যান্টের প্রবেশ ঘটে এক বিশাল জাঁকজমকের সাথে। নাট্যকার কনগ্রিভ তাঁকে বর্ণনা করেছেন এমনভাবে যে, তাঁর চারপাশে যেন এক মোহময় পরিবেশ তৈরি হয়। তিনি কেবল তাঁর রূপ দিয়ে নয়, বরং তাঁর কথা বলার ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাস দিয়ে পুরো স্টেজ দখল করে রাখতেন।


সংক্ষেপে মিলাম্যান্ট:

মিলাম্যান্ট চরিত্রটি দেখায় যে, ১৭০০ সালের দিকেও একজন নারী তাঁর প্রেমিকের প্রতি অনুগত থেকেও নিজের 'Individual Space' বা ব্যক্তিগত পরিসর দাবি করতে পারতেন। তিনি কোনো 'অসহায় নারী' (Damsel in distress) ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তাঁর নিজের জীবনের পরিচালক।

একেবারেই ঠিক বলেছেন! মিরাবেল ও মিলাম্যান্টের এই 'চুক্তিভিত্তিক প্রেম' (The Proviso Scene) আধুনিক সম্পর্কের এক বিস্ময়কর পূর্বাভাস। ১৮শ শতাব্দীর শুরুতে বসে উইলিয়াম কনগ্রিভ এমন এক সম্পর্কের রূপরেখা দিয়েছিলেন, যা আজকের Pre-nuptial Agreement বা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়া সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।

নিচে কেন একে আধুনিক সম্পর্কের ভিত্তি বলা হয়, তার কয়েকটি জোরালো কারণ দেওয়া হলো:


১. ব্যক্তিগত স্পেস বা ‘প্রাইভেসি’ (Individual Autonomy)

মিলাম্যান্ট যখন শর্ত দেন যে বিয়ের পর তিনি যখন খুশি চা খাবেন বা চিঠি লিখবেন এবং মিরাবেল তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, তখন তিনি মূলত আধুনিক 'Privacy' বা ব্যক্তিগত পরিসরের দাবি তুলছিলেন। আজ আমরা যাকে বলি "Giving space in a relationship", মিলাম্যান্ট তা ১৭০০ সালেই দাবি করেছিলেন।

২. রোমান্টিকতার চেয়ে বাস্তবতা বড় (Pragmatism over Romance)

নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের বৈশিষ্ট্যই ছিল যুক্তি। মধ্যযুগের বা এলিজাবেথান যুগের মতো "আমি তোমার জন্য মরে যাব" টাইপ অন্ধ প্রেম এখানে নেই। মিরাবেল ও মিলাম্যান্ট দুজনেই জানেন যে সংসার চালাতে গেলে টাকা (Dower/Property) লাগে এবং শান্তিতে থাকতে গেলে একে অপরের অভ্যাসের সাথে আপস করতে হয়। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

৩. সমঅধিকার ও সম্মন (Mutual Respect)

মিলাম্যান্ট শর্ত দিয়েছিলেন যে মিরাবেল তাকে 'My Dear' বা 'My Life' বলে সবার সামনে অতি-আদুরে সম্বোধন করে তার গাম্ভীর্য নষ্ট করতে পারবে না। এটি দেখায় যে, তিনি সম্পর্কের মধ্যে একজন পুতুল বা 'Object' হিসেবে নয়, বরং একজন সমান মর্যাদা সম্পন্ন 'Partner' হিসেবে থাকতে চেয়েছিলেন।


৪. আধুনিক সম্পর্কের সাথে তুলনা (Comparison)

প্রথাগত প্রেম (সেকাল)

মিরাবেল-মিলাম্যান্টের 'চুক্তি'

আধুনিক সম্পর্ক (একাল)

নারী সম্পূর্ণভাবে স্বামীর অনুগত।

নারী নিজের স্বাধীনতা ও শর্ত বজায় রাখে।

সম্পর্কের ভিত্তি পারস্পরিক সমঝোতা ও স্বাধীনতা।

আবেগ ও মোহ প্রধান।

যুক্তি ও আইনি রক্ষা কবজ প্রধান।

লজিক ও প্রাক-বিবাহ চুক্তি (Pre-nup) গুরুত্বপূর্ণ।

বিয়ের পর ব্যক্তিগত সত্তা বিলীন।

বিয়ের পরও নিজস্ব জগৎ বজায় রাখার দাবি।

‘মি-টাইম’ (Me-time) ও ক্যারিয়ারের গুরুত্ব।

Read More (Index-)

1. ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস  

2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস 

3.  অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস

4.  মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ

5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০১০৬৬)

6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬১৫০০

7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)  

8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur   

9. William Langland: Piers Plowman 

10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০১৬৬০

11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet  

12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus   

13.Edmund Spenser: The Faerie Queene     

14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)

15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০১৭৯৮

16. John Dryden: Absalom and Achitophel   

17. Alexander Pope: The Rape of the Lock 

18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)   

19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe  

20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮১৮৩২) : আবেগপ্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য 

21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads  :  বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব

22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা  প্রাচ্য  পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 

25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২১৯০১শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন

26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;

27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু 

28. Robert Browning: My Last Duchess  বিষয়বস্তু

29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles   বিষয়বস্তু 

30. আধুনিক যুগ (১৯০১১৯৩৯প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ 

31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড)  বিষয়বস্তু 

32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু  

33. James Joyce: Ulysses  :বিষয়বস্তু 

34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু 

35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯বর্তমানদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা 

36. Samuel Beckett: Waiting for Godot: বিষয়বস্তু 

37. George Orwell: 1984, Animal Farm: বিষয়বস্তু  

উপসংহার

নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ ছিল শৃঙ্খলার যুগ। এটি এলিজাবেথান যুগের বিশৃঙ্খলা ও অতি-আবেগ থেকে সরে এসে সাহিত্যকে একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ দিয়েছিল। তবে যুগের শেষের দিকে অতিরিক্ত নিয়মকানুনের প্রতি একঘেয়েমি থেকেই পরবর্তী 'রোমান্টিক যুগের' সূচনা হয়। পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com


Post a Comment

0 Comments