William Langland: Piers Plowman
উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ড রচিত মধ্যযুগের ইংরেজি সাহিত্যের এক অনবদ্য মহাকাব্য হলো 'পিয়ার্স প্লাউম্যান' (Piers Plowman)। এটি মূলত একটি রূপকধর্মী (Allegorical) কবিতা, যেখানে কবি স্বপ্নের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ, ধর্ম এবং মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার চিত্র তুলে ধরেছেন।
নিচে কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১. স্বপ্নের মাধ্যমে আখ্যান (The Dream Vision)
পুরো কবিতাটি কয়েকটি স্বপ্নের একটি সিরিজ। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র বা বর্ণনাকারী উইল (Will) মালভার্ন পাহাড়ে ঘুমিয়ে পড়েন এবং এক অদ্ভুত জগৎ দেখতে পান। এই 'উইল' চরিত্রটি একই সাথে মানুষের 'ইচ্ছা' (Will) এবং কবির নিজের সত্তাকে নির্দেশ করে।
২. ম্যালভার্ন পাহাড়ের দৃশ্য (The Fair Field Full of Folk)
উইল তার স্বপ্নে একটি উপত্যকা দেখেন যার একদিকে একটি উঁচু টাওয়ার (ঈশ্বরের স্বর্গ) এবং অন্যদিকে একটি গভীর গহ্বর (নরক)। এই দুইয়ের মাঝখানে একটি মাঠ যেখানে বিভিন্ন ধরণের মানুষ তাদের প্রতিদিনের কাজে ব্যস্ত। একে বলা হয়েছে "Fair Field Full of Folk"। এখানে ল্যাংল্যান্ড তৎকালীন সমাজের দুর্নীতি, লোভ এবং ভণ্ডামিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. পিয়ার্স প্লাউম্যানের ভূমিকা
গল্পের এক পর্যায়ে পিয়ার্স (Piers) নামক একজন সাধারণ কৃষক বা লাঙলধারীর আবির্ভাব ঘটে। সে সত্যের সন্ধানে আসা একদল তীর্থযাত্রীকে পথ দেখানোর দায়িত্ব নেয়। পিয়ার্স এখানে যিশু খ্রিস্টের প্রতীক বা একজন আদর্শ মানুষের রূপক, যে কঠোর পরিশ্রম এবং সততার মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথ দেখায়।
৪. তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় (Dowel, Dobet, and Dobest)
কবিতাটি মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির তিনটি স্তরের কথা বলে:
Dowel (Do Well): সততার সাথে কাজ করা এবং আইন মেনে চলা।
Dobet (Do Better): দানশীল হওয়া এবং অন্যের মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা।
Dobest (Do Best): আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব লাভ করা এবং মেষপালকের মতো সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করা।
৫. সামাজিক ও ধর্মীয় সমালোচনা
ল্যাংল্যান্ড এই কাব্যের মাধ্যমে চার্চের দুর্নীতি, লোভী পাদ্রী এবং বিচার ব্যবস্থার অসততাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা তীর্থযাত্রার মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব নয়; বরং শ্রম (Labor) এবং ভালোবাসার (Love) মাধ্যমেই মুক্তি মেলে।
মূল নির্যাস (Theme)
'পিয়ার্স প্লাউম্যান' কেবল একটি ধর্মীয় কবিতা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়ের একটি দলিল। এর মূল বার্তা হলো—সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সাধারণ জীবন যাপন করাই হলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর শ্রেষ্ঠ উপায়।
Lady Meed' এবং 'The Harrowing of Hell'—এই দুটি অংশই কবিতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময় দিক। নিচে এগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. লেডি মিড (Lady Meed): দুর্নীতির রূপক
'লেডি মিড' চরিত্রটি ল্যাংল্যান্ডের সামাজিক সমালোচনার এক শক্তিশালী অস্ত্র। 'Meed' শব্দের অর্থ হলো 'পুরস্কার' বা 'পারিশ্রমিক', কিন্তু কবিতায় তাকে ঘুষ (Bribery) এবং লোভের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পরিচয়: সে একজন অত্যন্ত সুন্দরী এবং ঐশ্বর্যশালী নারী, কিন্তু তার চরিত্র কলুষিত। সে অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে রাজদরবার এবং বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বিবাহের চক্রান্ত: লেডি মিডের বিয়ে ঠিক হয় 'ফলস' (Falsehood)-এর সাথে। কিন্তু 'থিওলজি' (Theology) এতে বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি রাজার দরবারে গড়ায়।
বিবেকের জয়: রাজা চান লেডি মিডের বিয়ে 'কনসায়েন্স' (Conscience) বা বিবেকের সাথে হোক। কিন্তু 'কনসায়েন্স' তাকে প্রত্যাখ্যান করে বলে যে, মিড কেবল বিচারকদের পথভ্রষ্ট করে এবং প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে।
বার্তা: এই চরিত্রের মাধ্যমে ল্যাংল্যান্ড বুঝিয়েছেন যে, সমাজে যখন সততার চেয়ে টাকার মূল্য বেশি হয়, তখন ধর্ম ও ন্যায়বিচার বিপন্ন হয়।
২. দ্য হ্যারোইং অফ হেল (The Harrowing of Hell): আধ্যাত্মিক বিজয়
এটি কবিতার সবচেয়ে মহিমান্বিত এবং নাটকীয় অংশ। এখানে পিয়ার্স প্লাউম্যান বা যিশু খ্রিস্টের বীরত্বপূর্ণ রূপ ফুটে ওঠে।
ঘটনা: যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি নরকে প্রবেশ করেন।
শয়তানের সাথে যুদ্ধ: তিনি নরকের দরজা ভেঙে ফেলেন এবং শয়তান বা লুসিফারের হাত থেকে সৎ আত্মাদের (যেমন আদম, ইভ এবং অন্যান্য নবীদের) উদ্ধার করেন।
আলো বনাম অন্ধকার: এখানে ল্যাংল্যান্ড চমৎকারভাবে আলো এবং অন্ধকারের যুদ্ধ দেখিয়েছেন। যিশু এখানে একজন অপরাজেয় যোদ্ধার মতো, যিনি মৃত্যুকে জয় করে মানুষের জন্য মুক্তির পথ প্রশস্ত করেন।
পিয়ার্সের সাথে মিলন: এই অংশে পিয়ার্স এবং যিশু একীভূত হয়ে যান। পিয়ার্স কেবল একজন কৃষক থাকে না, সে মানবজাতির রক্ষাকর্তায় পরিণত হয়।
'Will' (উইল) চরিত্রটি এই মহাকাব্যের কেন্দ্রবিন্দু। ল্যাংল্যান্ড এখানে 'উইল' নামটি খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন, কারণ এটি একই সাথে কবির নিজের নাম এবং মানুষের 'ইচ্ছা' (Human Will)-এর প্রতীক।
উইলের আধ্যাত্মিক যাত্রা বা নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অনুসন্ধিৎসু কিন্তু বিভ্রান্ত (The Search for Truth)
শুরুতে উইল একজন সাধারণ মানুষের মতো বিভ্রান্ত। সে সত্য (Truth) এবং মিথ্যা (Falsehood)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। সে জ্ঞান অর্জনের জন্য মরিয়া, কিন্তু তার অহংকার এবং অধৈর্য তাকে বারবার ভুল পথে চালিত করে। সে কেবল বই পড়ে বা তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে ঈশ্বরকে পেতে চায়, যা তার প্রথম বড় ভুল ছিল।
২. বুদ্ধিবৃত্তি বনাম ভক্তি (Intellect vs. Faith)
উইল যখন Thought (চিন্তা), Wit (বুদ্ধি), এবং Study (অধ্যয়ন)-এর সাথে দেখা করে, সে বুঝতে পারে যে কেবল জ্ঞান দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব নয়। সে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং বুঝতে পারে যে তার পাণ্ডিত্য তাকে সত্যের কাছাকাছি নয়, বরং আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
৩. পিয়ার্সের মাধ্যমে শিক্ষা (The Lesson of Labor)
উইলের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে যখন সে দেখে যে একজন সাধারণ কৃষক, পিয়ার্স, কোনো বড় শাস্ত্র না পড়েও কেবল সততা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সত্যের পথ চেনে। উইল এখান থেকে শেখে যে:
সততাই বড় তীর্থ: কেবল পবিত্র স্থানে গেলেই পুণ্য হয় না, নিজের কাজ সততার সাথে করাই আসল ধর্ম।
বিনয় (Humility): অহংকার ত্যাগ না করলে সত্যের আলো দেখা যায় না।
৪. যিশুর প্রেমে রূপান্তর
কবিতার শেষের দিকে উইলের চরিত্রটি আরও পরিপক্ক হয়। সে যখন যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং নরক জয়ের দৃশ্য দেখে, তখন তার 'ইচ্ছা' (Will) জাগতিক মোহ থেকে সরে গিয়ে ঐশ্বরিক ভালোবাসার দিকে ধাবিত হয়। সে বুঝতে পারে যে 'Charity' বা নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ।
উইলের যাত্রার সারাংশ (The Cycle of Learning)
উইল আসলে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিচ্ছবি—যে বারবার ভুল করে, হোঁচট খায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যের সন্ধানে হাল ছাড়ে না।
অবশ্যই! উইলের জীবন এবং তার আধ্যাত্মিক উন্নতির এই তিনটি স্তর—Dowel (Do-Well), Dobet (Do-Better), এবং Dobest (Do-Best)—বোঝা খুবই জরুরি। কারণ ল্যাংল্যান্ড মনে করতেন, একজন মানুষ রাতারাতি সাধু হয়ে যায় না, তাকে ধাপে ধাপে উন্নতি করতে হয়।
নিচে একটি ছকের মাধ্যমে উইলের জীবনের সাথে এই তিনটির সংযোগ দেখানো হলো:
উইলের আধ্যাত্মিক যাত্রার ছক
বিস্তারিত ব্যাখ্যা: উইলের উত্তরণ
১. Dowel (সততার স্তর): উইল শুরুতে বুঝতে পারে না যে কীভাবে বাঁচতে হবে। সে যখন পিয়ার্সকে দেখে যে সে লাঙল চালাচ্ছে এবং সততার সাথে সমাজকে খাওয়াচ্ছে, তখন উইল শেখে যে "কাজই ধর্ম"। এটি হলো সাধারণ মানুষের জন্য প্রথম ধাপ।
২. Dobet (ভালোবাসার স্তর): উইল যখন যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন সে বুঝতে পারে যে কেবল আইন মেনে চলাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের জন্য কিছু করা। এখানে উইলের 'ইচ্ছা' (Will) আরও শুদ্ধ হয়। সে শেখে যে ভালোবাসাই সব আইনের উর্ধ্বে।
৩. Dobest (ঐক্য ও রক্ষার স্তর): সবশেষে, উইল চার্চের পতন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে বুঝতে পারে যে সমাজকে রক্ষা করার জন্য 'Dobest' হওয়া প্রয়োজন, অর্থাৎ যেখানে শক্তি এবং পবিত্রতা মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস 
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০) 
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales) 
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur 
9. William Langland: Piers Plowman 
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০) 
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet 
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus 
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene 
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮) 
16. John Dryden: Absalom and Achitophel 
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock 
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস) 
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe 
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য 
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব: 
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব 
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু 
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু 
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ 
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু 
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু 
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু 
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু 
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা 
উপসংহার
উইলের জন্য এই যাত্রাটি সহজ ছিল না। সে বারবার ঘুমিয়ে পড়ে, আবার জেগে ওঠে—যা মানুষের জীবনের উত্থান-পতনের প্রতীক। ল্যাংল্যান্ড দেখাতে চেয়েছেন যে, আমরা হয়তো নিখুঁত নই, কিন্তু 'Dowel' থেকে শুরু করে 'Dobest'-এর দিকে যাওয়ার চেষ্টাই হলো আসল মানবতা। পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com

0 Comments