জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales) মধ্যযুগের ইংরেজি সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি। এর বিষয়বস্তু বা মূল উপজীব্য বিষয়গুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
মূল প্রেক্ষাপট (The Framework)
গল্পটির শুরু হয় লন্ডনের 'টাবার্ড ইন' (Tabard Inn) নামের একটি সরাইখানা থেকে। সেখানে ২৯ জন তীর্থযাত্রী একত্রিত হয়েছেন। তারা সবাই মিলে কেন্ট-এর ক্যান্টারবেরি ক্যাথেড্রালে অবস্থিত সন্ত টমাস বেকেটের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাচ্ছেন।
যাত্রার একঘেয়েমি কাটাতে সরাইখানার মালিক হ্যারি বেইলি একটি প্রস্তাব দেন:
প্রত্যেক তীর্থযাত্রী যাওয়ার পথে দুটি এবং ফেরার পথে দুটি করে মোট চারটি গল্প বলবেন।
যার গল্প সবচেয়ে ভালো হবে, তাকে ফেরার পর একটি চমৎকার নৈশভোজ উপহার দেওয়া হবে।
বিষয়বস্তু ও বৈচিত্র্য (Themes and Variety)
চসার এই তীর্থযাত্রাকে একটি কাঠামোর মতো ব্যবহার করেছেন যার ভেতরে তিনি তৎকালীন সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এঁকেছেন।
সামাজিক চিত্র: এতে রাজা-বাদশাহ ছাড়া সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ উপস্থিত আছে—যেমন নাইট (যোদ্ধা), সন্ন্যাসিনী, পাচক, আইনজীবী, ডাক্তার এবং একজন সাধারণ তন্তুবায় (Wife of Bath)।
গল্পের ধরণ: প্রতিটি চরিত্রের পেশা ও রুচি অনুযায়ী গল্পের ধরণ ভিন্ন। যেমন:
নাইটের গল্প (The Knight's Tale): এটি বীরত্ব এবং উচ্চবংশীয় প্রেমের কাহিনী।
মিলারের গল্প (The Miller's Tale): এটি মূলত একটি স্থূল এবং হাস্যকর গল্প (Fabliau)।
পার্সন বা ধর্মযাজকের কথা: এটি নৈতিকতা ও ধর্মের ওপর দীর্ঘ আলোচনা।
ধর্মীয় বিদ্রূপ: চসার চার্চের দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলেছেন। রিলিজিয়াস চরিত্রগুলোর (যেমন Pardoner বা Summoner) ভণ্ডামি ও লোভকে তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
নারীর অবস্থান ও বিবাহ: 'ওয়াইফ অফ বাথ' (Wife of Bath)-এর গল্পের মাধ্যমে সেই সময়ে নারীর অধিকার, ক্ষমতা এবং বৈবাহিক জীবন নিয়ে সাহসী মতামত প্রকাশ করা হয়েছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
১. ইংরেজি ভাষার ভিত্তি: এটি ল্যাটিন বা ফরাসি ভাষার বদলে সাধারণ মানুষের ইংরেজি ভাষায় (Middle English) লেখা।
২. চরিত্রায়ন: চসার প্রতিটি চরিত্রকে এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন যে তারা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
৩. বাস্তববাদ: এটি নিছক কল্পনা নয়, বরং ১৪শ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
দ্রষ্টব্য: চসার পরিকল্পনা করেছিলেন ১২০টি গল্প লেখার, কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি মাত্র ২৪টি গল্প সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলেন।
চসার ১২০টি গল্প লেখার পরিকল্পনা করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৪টি গল্প লিখে যেতে পেরেছেন (যদিও এর মধ্যে কয়েকটি অসম্পূর্ণ)। এই গল্পগুলো যারা বলেছেন, তাদের নামানুসারে গল্পের নামকরণ করা হয়েছে।
নিচে চসারের তীর্থযাত্রীদের সেই ২৪টি গল্পের তালিকা দেওয়া হলো:
তীর্থযাত্রীদের গল্পের তালিকা
কিছু বিশেষ তথ্য
The Knight's Tale হলো বইটির দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে মহিমান্বিত গল্প।
The Miller's Tale এবং The Reeve's Tale মূলত নিচুতলার মানুষের সাধারণ ও স্থূল রসিকতা নিয়ে লেখা।
The Parson's Tale কোনো গল্প নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ ধর্মোপদেশ যা পুরো গ্রন্থটির শেষে একটি পবিত্র আবহ তৈরি করে।
পাঠকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বিতর্কমূলক দুটি গল্পের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো। একটিতে আছে নারীর অধিকারের কথা, আর অন্যটিতে লোভের পরিণাম।
১. ওয়াইফ অফ বাথ-এর গল্প (The Wife of Bath's Tale)
এই চরিত্রটি চসারের সবচেয়ে আধুনিক এবং সাহসী চরিত্র। তার গল্পের মূল প্রশ্ন হলো: "নারীরা আসলে কী চায়?"
গল্পের শুরু: আর্থারীয় যুগের এক নাইট এক তরুণীকে লাঞ্ছিত করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। রানি তাকে এক বছর সময় দেন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য: "নারীরা সবচেয়ে বেশি কী চায়?"
উত্তর খোঁজা: নাইট চারদিকে ঘোরে কিন্তু একেকজন একেক উত্তর দেয় (কেউ বলে টাকা, কেউ বলে সাজগোজ)। অবশেষে এক কুৎসিত বৃদ্ধা তাকে সঠিক উত্তরটি বলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে বিনিময়ে নাইটকে তাকে বিয়ে করতে হবে।
আসল উত্তর: বৃদ্ধার শেখানো উত্তরটি ছিল— "নারীরা তাদের স্বামী বা প্রেমিকের ওপর সার্বভৌম ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব (Sovereignty) চায়।" উত্তরটি সঠিক বলে গৃহীত হয় এবং নাইটের প্রাণ বাঁচে।
পরিণতি: অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাইট সেই কুৎসিত বৃদ্ধাকে বিয়ে করে। বাসর রাতে বৃদ্ধা তাকে দুটি বিকল্প দেয়: সে কুৎসিত কিন্তু বিশ্বস্ত থাকবে, নাকি সুন্দরী কিন্তু অবিশ্বস্ত হবে? নাইট উত্তর দেয় যে, সিদ্ধান্তটি বৃদ্ধার ওপরই থাকুক। অর্থাৎ নাইট তাকে কর্তৃত্ব দিয়ে দেয়। এতে খুশি হয়ে বৃদ্ধা এক সুন্দরী ও বিশ্বস্ত নারীতে রূপান্তরিত হয়।
২. দ্য পারডনার-এর গল্প (The Pardoner's Tale)
পারডনার নিজে একজন ভণ্ড ও লোভী মানুষ যে মানুষের পাপ মোচনের নামে টাকা নিত। সে তার গল্পের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে— "লোভই সকল মন্দের মূল" (Radix malorum est cupiditas)।
গল্পের শুরু: তিন বন্ধু একটি সরাইখানায় বসে মদ্যপান করছিল। তারা খবর পায় যে 'মৃত্যু' (Death) তাদের এক বন্ধুকে নিয়ে গেছে। ক্রুদ্ধ হয়ে তারা 'মৃত্যু'কে খুঁজে বের করে তাকে মেরে ফেলার শপথ নেয়।
গুপ্তধন লাভ: খুঁজতে খুঁজতে এক বৃদ্ধের নির্দেশে তারা একটি গাছের নিচে যায়। সেখানে তারা 'মৃত্যু'কে পায় না, বরং এক গাদা স্বর্ণমুদ্রা পায়।
লোভ ও ষড়যন্ত্র: তারা ঠিক করে রাত হলে টাকাগুলো বাড়িতে নিয়ে যাবে। ছোট বন্ধুটিকে খাবার ও মদ আনতে শহরে পাঠানো হয়। সে যাওয়ার পর বাকি দুজন পরিকল্পনা করে তাকে মেরে ফেলার, যাতে তারা দুজনে সব টাকা ভাগ করে নিতে পারে। ওদিকে ছোট বন্ধুটিও লোভে পড়ে মদে বিষ মিশিয়ে দেয় যাতে সে একাই সব টাকা পায়।
করুণ পরিণতি: ছোটটি ফিরে এলে বাকি দুজন তাকে হত্যা করে। এরপর তারা আনন্দ করে সেই বিষ মেশানো মদ পান করে এবং দুজনেই মারা যায়। এভাবেই তারা 'মৃত্যু'র সন্ধান পায়।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন (কনকপুর)পাঁশকুড়া : পূর্বমেদিনীপুর : email :lib.pbc@gmail.com
Read More (Index-)
2. অ্যাংলো স্যাক্সন যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
3. অ্যাংলো নরম্যান যুগ : ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস
4. মিডল ইংলিশ পিরিয়ড এবং চসারের যুগ
5. ওল্ড ইংলিশ বা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ (৪৫০–১০৬৬)
6.মিডল ইংলিশ বা মধ্যযুগ (১০৬৬–১৫০০)
7. জেফ্রি চসারের 'দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস' (The Canterbury Tales)
8. Sir Thomas Malory: Le Morte d'Arthur
9. William Langland: Piers Plowman
10. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ (১৫০০–১৬৬০)
11. William Shakespeare: Hamlet, Macbeth, Romeo and Juliet
12. Christopher Marlowe: Doctor Faustus
13.Edmund Spenser: The Faerie Queene
14. John Milton: Paradise Lost (প্যারাডাইস লস্ট)
15.নিও-ক্লাসিক্যাল যুগ (১৬৬০–১৭৯৮)
16. John Dryden: Absalom and Achitophel
17. Alexander Pope: The Rape of the Lock
18. Jonathan Swift: Gulliver's Travels (গালিভার্স ট্রাভেলস)
19. Daniel Defoe: Robinson Crusoe
20. রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮–১৮৩২) : আবেগ, প্রকৃতি এবং কল্পনার জয়গান ছিল এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য
21. William Wordsworth & S.T. Coleridge: Lyrical Ballads : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব:
22. John Keats: Ode to a Nightingale : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
23. P.B. Shelley: Ode to the West Wind : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
24. Jane Austen: Pride and Prejudice : বিষয়বস্তু আলোচনা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রভাব
25. ভিক্টোরিয়ান যুগ (১৮৩২–১৯০১) শিল্প বিপ্লব এবং সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
26. Charles Dickens: David Copperfield, A Tale of Two Cities;
27. Lord Tennyson: In Memoriam: বিষয়বস্তু
28. Robert Browning: My Last Duchess বিষয়বস্তু
29. Thomas Hardy: Tess of the d'Urbervilles বিষয়বস্তু
30. আধুনিক যুগ (১৯০১–১৯৩৯) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এবং মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ
31. T.S. Eliot: The Waste Land (দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড) বিষয়বস্তু
32. Virginia Woolf: Mrs Dalloway: বিষয়বস্তু
33. James Joyce: Ulysses :বিষয়বস্তু
34. George Bernard Shaw: Pygmalion: বিষয়বস্তু
35. উত্তর-আধুনিক যুগ (১৯৩৯–বর্তমান) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাহিত্যে অনিশ্চয়তা

0 Comments