আদিপর্ব: কুরু-পাণ্ডবদের জন্ম ও বাল্যকাল

 



আদিপর্বকুরু-পাণ্ডবদের জন্ম  বাল্যকাল।

মহাভারতের আদিপর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই কুরু পাণ্ডব বংশের ভিত্তি এবং তাঁদের মধ্যেকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বীজ বপন করা হয়েছিল। কুরু-পাণ্ডবদের জন্ম বাল্যকালের মূল ঘটনাপ্রবাহ নিচে আলোচনা করা হলো:

. ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু বিদুরের জন্ম

বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর বংশ রক্ষার্থে মহর্ষি বেদব্যাসের আশীর্বাদে অম্বিকা, অম্বালিকা এক দাসীর গর্ভে তিন পুত্রের জন্ম হয়:

ধৃতরাষ্ট্র: অম্বিকার পুত্র, যিনি জন্মান্ধ ছিলেন।

পাণ্ডু: অম্বালিকার পুত্র, যিনি পাণ্ডুবর্ণ (ফ্যাকাশে) হয়ে জন্মেছিলেন।

বিদুর: দাসীর পুত্র, যিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ জ্ঞানী ছিলেন।

. শত কৌরব পঞ্চ পাণ্ডবের জন্ম

কৌরবদের জন্ম: ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারী এক লোহপিণ্ড প্রসব করেন। ব্যাসদেবের পরামর্শে সেই পিণ্ডকে ১০০টি ঘৃতপূর্ণ কলসে রাখা হয়। সেখান থেকে ১০০ ভাই (দুযোধন, দুঃশাসন প্রমুখ) এবং এক বোন দুঃশলার জন্ম হয়।

পাণ্ডবদের জন্ম: রাজা পাণ্ডু অভিশপ্ত হওয়ায় স্ত্রীগমন করতে পারতেন না। কুন্তী তাঁর প্রাপ্ত দুর্বাসা মুনির মন্ত্রবলে দেবতাদের আহ্বান করেন।

যমরাজ থেকে যুধিষ্ঠির, বায়ু থেকে ভীম এবং ইন্দ্র থেকে অর্জুনের জন্ম হয়।

কুন্তীর উপদেশে মাদ্রী ওই মন্ত্র ব্যবহার করে অশ্বিনীকুমারদ্বয় থেকে নকুল সহদেবকে লাভ করেন।


. বাল্যকাল শত্রুতার সূচনা

পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুন্তী পাঁচ পুত্রকে নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। সেখানে কুরু পাণ্ডব রাজপুত্ররা একসাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। তবে শুরু থেকেই তাঁদের মধ্যে রেষারেষি দেখা দেয়:

ভীমের শারীরিক শক্তি: ভীম একাই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের শারীরিক খেলায় নাজেহাল করতেন। এতে দুর্যোধনের মনে প্রবল ঈর্ষা ক্রোধ জন্মায়।

বিষপ্রয়োগের চেষ্টা: ঈর্ষান্বিত হয়ে দুর্যোধন ভীমকে বিষ খাইয়ে গঙ্গায় ফেলে দেন। কিন্তু ভীম নাগলোকে পৌঁছে অমৃত পান করে আরও দশ হাজার হাতির বল নিয়ে ফিরে আসেন।

অস্ত্রশিক্ষা: রাজপুত্রদের শিক্ষার ভার প্রথমে কৃপাচার্য এবং পরে দ্রোণাচার্যের ওপর পড়ে। দ্রোণাচার্য অর্জুনকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনুর্বীর হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করেন।

. লক্ষ্যভেদ লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া

বাল্যকাল শেষ হওয়ার মুখেই অর্জুনের একাগ্রতা (পাখির চোখ ভেদ করা) এবং ভীমের গদাযুদ্ধের পারদর্শিতা প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে, দুর্যোধন শকুনির ষড়যন্ত্র পাণ্ডবদের হস্তিনাপুর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে 'জতুগৃহ' দাহ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দিকে মোড় নেয়।

মহাভারতের আদিপর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চন্দ্রবংশ এবং রাজা শান্তনুর উপাখ্যান। এখান থেকেই কুরুবংশের মূল শাখা এবং মহাযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। নিচে এর প্রধান ঘটনাক্রম তুলে ধরা হলো:

. চন্দ্রবংশের উৎপত্তি

পুরাণ অনুযায়ী, এই বংশের আদি পুরুষ হলেন চন্দ্র (সোম) তাঁর পুত্র বুধ এবং বুধের পুত্র পুরূরবা থেকে এই রাজবংশের বিস্তার। এই বংশেই ভরত, হস্তী (যিনি হস্তিনাপুর প্রতিষ্ঠা করেন) এবং কুরু জন্মগ্রহণ করেন। এই পবিত্র বংশের একজন মহিমান্বিত রাজা ছিলেন শান্তনু।

. শান্তনু গঙ্গার মিলন

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, রাজা শান্তনু গঙ্গার তীরে এক পরমাসুন্দরী নারীকে দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। সেই নারী (দেবী গঙ্গা) একটি শর্তে রাজি হন:

"আমি যাই করি না কেন, আপনি কখনো আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না বা বাধা দিতে পারবেন না। যেদিন আপনি প্রশ্ন করবেন, সেদিনই আমি আপনাকে ত্যাগ করব।"

শান্তনু শর্ত মেনে নেন। একে একে গঙ্গার গর্ভে সাতটি সন্তান জন্ম নেয়, কিন্তু জন্মের পরেই গঙ্গা তাঁদের নদীতে বিসর্জন দেন। শান্তনু পুত্রশোকে কাতর হলেও শর্তের ভয়ে কিছু বলতে পারছিলেন না।

. দেবব্রতের (ভীষ্ম) জন্ম গঙ্গার বিদায়

যখন অষ্টম সন্তানের জন্ম হলো, গঙ্গা তাকেও নদীতে ফেলতে যাচ্ছিলেন। তখন শান্তনু আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বাধা দেন এবং গঙ্গার আচরণের কারণ জানতে চান।

গঙ্গা জানান যে, এই সন্তানরা ছিলেন অভিশপ্ত অষ্টবসু, যাঁদের মর্ত্যে জন্ম নিতে হয়েছিল। গঙ্গা তাঁদের মুক্তি দিচ্ছিলেন।

যেহেতু শান্তনু শর্ত ভেঙেছেন, তাই গঙ্গা অষ্টম সন্তানকে নিয়ে চলে যান এবং জানান যে সময় হলে তিনি পুত্রকে ফিরিয়ে দেবেন। এই অষ্টম পুত্রই হলেন দেবব্রত, যিনি পরবর্তীকালে ভীষ্ম নামে পরিচিত হন।


. শান্তনু সত্যবতী (মৎস্যগন্ধা)

বহু বছর পর, শান্তনু যমুনা নদীর তীরে সত্যবতী নামক এক ধীবর কন্যার রূপে মুগ্ধ হন। তিনি সত্যবতীকে বিবাহ করতে চাইলে তাঁর পিতা (দাশরাজ) একটি কঠিন শর্ত রাখেন:

"সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই হস্তিনাপুরের পরবর্তী রাজা হবে, দেবব্রত নয়।"

শান্তনু তাঁর যোগ্য পুত্র দেবব্রতের অধিকার কেড়ে নিতে চাননি, তাই তিনি বিমর্ষ হয়ে ফিরে আসেন।

. ভীষ্মের ভীষণ প্রতিজ্ঞা

পিতার মানসিক অবস্থা দেখে দেবব্রত সত্যবতীর পিতার কাছে যান। পিতার সুখের জন্য তিনি দুটি কঠোর প্রতিজ্ঞা করেন:

তিনি রাজসিংহাসন ত্যাগ করবেন (যাতে সত্যবতীর পুত্র রাজা হতে পারে)

তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করবেন (যাতে তাঁর কোনো বংশধর ভবিষ্যতের সিংহাসন নিয়ে দাবি না তোলে)

এই আকাশছোঁয়া ত্যাগের কারণে দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করেন এবং তাঁর নাম হয় 'ভীষ্ম' শান্তনু খুশি হয়ে পুত্রকে **'ইচ্ছামৃত্যু'** বর দান করেন।


. পরবর্তী বংশধারা

শান্তনু সত্যবতীর বিবাহ হয় এবং তাঁদের দুই পুত্র জন্মায়চিত্রাঙ্গদ বিচিত্রবীর্য।

চিত্রাঙ্গদ অল্প বয়সে এক গন্ধর্বের সাথে যুদ্ধে মারা যান।

বিচিত্রবীর্য রাজা হন এবং তাঁর দুই স্ত্রী ছিলেন অম্বিকা অম্বালিকা।

বিচিত্রবীর্যের অকাল মৃত্যুর পর রাজবংশ বিলুপ্ত হওয়ার পথে বসলে, সত্যবতীর পূর্বের পুত্র মহর্ষি বেদব্যাসের সাহায্যে অম্বিকা অম্বালিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুর জন্ম হয়।

মহাভারতের আদিপর্বে পরাশর মুনি এবং সত্যবতীর (তৎকালীন মৎস্যগন্ধা) মিলন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কারণ এর মাধ্যমেই মহর্ষি বেদব্যাসের জন্ম হয়, যিনি কুরুবংশের রক্ষাকর্তা এবং মহাভারতের রচয়িতা।

ঘটনাটি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

. মৎস্যগন্ধার পরিচয়

সত্যবতী ছিলেন উপরিচর বসুর কন্যা, কিন্তু এক অভিশপ্ত অপ্সরার (অদ্রিকা) গর্ভে মাছের পেটে তাঁর জন্ম হয়। তাই তাঁর গায়ের রং ছিল কালো এবং শরীর থেকে তীব্র মাছের গন্ধ বের হতো। এই কারণে তাঁর নাম ছিল মৎস্যগন্ধা। তিনি তাঁর পালক পিতা দাশরাজের নির্দেশে যমুনা নদীতে নৌকা চালিয়ে যাত্রী পারাপার করতেন।

. পরাশর মুনির সঙ্গে সাক্ষাৎ

একদিন মহর্ষি পরাশর তীর্থভ্রমণে বের হয়ে যমুনা পার হওয়ার জন্য মৎস্যগন্ধার নৌকায় ওঠেন। যমুনার মাঝপথে ঋষি পরাশর মৎস্যগন্ধার রূপে মুগ্ধ হন এবং তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

. সত্যবতীর তিনটি শর্ত

পরাশর মুনির প্রস্তাব শুনে সত্যবতী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে তিনটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং ঋষি তাঁর তপোবলে সেই সমস্যাগুলো সমাধান করেন:

লোকলজ্জার ভয়: সত্যবতী বলেন যে দিনের আলোয় সবার সামনে এই কাজ সম্ভব নয়। তখন পরাশর মুনি তাঁর যোগবলে চারপাশ কৃত্রিম কুয়াশা দিয়ে ঢেকে দেন, যাতে কেউ তাঁদের দেখতে না পায়।

কন্যাকত্ব রক্ষা: সত্যবতী ভয় পাচ্ছিলেন যে তাঁর কুমারীত্ব নষ্ট হবে। পরাশর মুনি তাঁকে আশীর্বাদ করেন যে মিলনের পরেও তাঁর কন্যাকত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে।

শরীরের দুর্গন্ধ: সত্যবতী তাঁর মাছের গন্ধ নিয়ে লজ্জিত ছিলেন। পরাশর মুনি তাঁকে আশীর্বাদ করেন যে তাঁর গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যোজনব্যাপী সুগন্ধ (কস্তুরীর ঘ্রাণ) ছড়িয়ে পড়বে। এর ফলে তাঁর নাম হয় 'যোজনগন্ধা'

. মহর্ষি বেদব্যাসের জন্ম

পরাশর মুনির আশীর্বাদে এবং তাঁদের মিলনের ফলে যমুনার একটি দ্বীপে তৎক্ষণাৎ একটি পুত্রের জন্ম হয়।

দ্বীপের (দ্বীপে) জন্ম হওয়ায় তাঁর নাম হয় দ্বৈপায়ন।

গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ হওয়ায় তাঁর নাম হয় কৃষ্ণ।

পরবর্তীতে বেদকে চার ভাগে বিভক্ত করায় তিনি 'বেদব্যাস' নামে পরিচিত হন।

ব্যাসদেব জন্মের পরেই তাঁর মা সত্যবতীকে কথা দেন যে, মা যখনই তাঁকে স্মরণ করবেন, তখনই তিনি উপস্থিত হবেন। পরবর্তীতে বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর যখন কুরুবংশ বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়, তখন সত্যবতী ব্যাসদেবকে স্মরণ করেন এবং তাঁর মাধ্যমেই ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু বিদুরের জন্ম হয়।

 

Post a Comment

0 Comments