সাহিত্যে অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা : সমরেশ বসুর 'প্রজাপতি' ও 'বিবর': ষাটের দশকে এই বইগুলো নিয়ে সমাজ উত্তাল হয়েছিল এবং আইনি লড়াই চলেছিল

 


 সাহিত্যে অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা  : সমরেশ বসুর 'প্রজাপতি' 'বিবর': ষাটের দশকে এই বইগুলো নিয়ে সমাজ উত্তাল হয়েছিল এবং আইনি লড়াই চলেছিল

বাংলা সাহিত্যে 'অশ্লিলতা' এবং 'বাস্তবতা' দ্বন্দ্ব এক চিরন্তন বিতর্ক তবে ষাটের দশকে সমরেশ বসুর 'বিবর' (১৯৬৫) এবং 'প্রজাপতি' (১৯৬৭) উপন্যাস দুটিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক যে চরম আকার ধারণ করেছিল, তা সাহিত্য ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

নিচে এই বিতর্কের মূল দিকগুলো এবং আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হলো:


. 'বিবর' 'প্রজাপতি': সমাজ মনস্তত্ত্বের নতুন রূপ

সমরেশ বসু এই দুই উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সমাজের তথাকথিত ভব্যতার মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন

বিবর: এখানে নায়ক এক অপরাধবোধ যৌন বিকারের মধ্য দিয়ে নিজের অন্তরের 'বিবর' বা গর্তকে খুঁজে পায় এটি ছিল অস্তিত্ববাদী সংকটের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ

প্রজাপতি: সুখেন নামক এক যুবকের উশৃঙ্খল জীবন, যৌনতা এবং রাজনৈতিক আদর্শহীনতার গল্প এতে ব্যবহৃত ভাষা এবং যৌন বর্ণনা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ মেনে নিতে পারেনি

. অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা: মূল দ্বন্দ্ব

সাহিত্যে সমরেশ বসু যা লিখেছিলেন, তা কি কেবল সস্তার উত্তেজনা (Obscenity) নাকি জীবনের রূঢ় সত্য (Realism)?

বাস্তবতার যুক্তি: সমরেশ বসুর সমর্থকদের মতে, তিনি সমাজের অন্ধকার দিক, মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এবং আধুনিক জীবনের শূন্যতাকে তুলে ধরেছিলেন বাস্তব জীবন সবসময় 'শুচি' বা পবিত্র নয়, তাই সাহিত্যও সবসময় সুন্দর হবে এমন কোনো কথা নেই

অশ্লীলতার অভিযোগ: বিরোধীদের মতে, এই বইগুলোতে ব্যবহৃত ভাষা এবং যৌনক্রিয়ার বর্ণনা সামাজিক অবক্ষয় ঘটাবে এবং তরুণ প্রজন্মকে বিপথে চালিত করবে বিশেষ করে 'প্রজাপতি' উপন্যাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারায় মামলা করা হয়


. আইনি লড়াই ঐতিহাসিক রায়

'প্রজাপতি' উপন্যাসটি নিয়ে মামলা নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়

নিষেধাজ্ঞা: ১৯৭৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট 'প্রজাপতি' বইটিকে অশ্লীল ঘোষণা করে এবং এর বিক্রয় প্রচার নিষিদ্ধ করে আদালত মনে করেছিল, এই রচনাটি সাধারণ পাঠকের মনে কামুকতা বা হীন ভাবনার উদ্রেক করতে পারে

সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় (১৯৮৫): দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বিচারপতি আর. এস. পাঠক এক ঐতিহাসিক রায়ে জানান যে, যৌনতার বর্ণনা থাকলেই কোনো সাহিত্য অশ্লীল হয়ে যায় না যদি সেই বর্ণনার পিছনে একটি শৈল্পিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য থাকে, তবে তাকে অশ্লীল বলা যাবে না


. সাহিত্যের জয়

এই আইনি জয় কেবল সমরেশ বসুর ব্যক্তিগত জয় ছিল না, এটি ছিল লেখকের 'প্রকাশের স্বাধীনতা' জয় সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভারতীয় সাহিত্যে অশ্লীলতার মানদণ্ড বদলে দেয় প্রমাণিত হয় যে:

. সাহিত্যকে তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে, বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ বা শব্দ দিয়ে নয়

. লেখকের কাজ সমাজকে আয়না দেখানো, সমাজ সেই আয়নায় নিজের কদর্য রূপ দেখে বিরক্ত হলে লেখককে দোষ দেওয়া যায় না

উপসংহার:

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে 'বিবর' বা 'প্রজাপতি' কেবল বিতর্কের উপাদান নয়, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক সমরেশ বসু দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের অবদমিত বাসনা এবং সমাজের পচনকে অস্বীকার করে মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়

 


Post a Comment

0 Comments